২৯ জুলাই ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন (Mohun Bagan Day)। ১৯১১ সালের এই দিনেই মোহনবাগান আইএফএ শিল্ড জিতে এমন এক ইতিহাস গড়ে, যা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না, বরং পরাধীন ভারতের আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাই প্রতি বছর ২৯ জুলাই ‘মোহনবাগান দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালে এই ঐতিহাসিক ঘটনার ১১৫তম বর্ষেও সবুজ-মেরুন সমর্থকদের আবেগ একই রকম উজ্জ্বল।
এই বিশেষ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “গর্বের ২৯শে জুলাই। মোহনবাগান দিবসে সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। জয় মোহনবাগান।” তাঁর শুভেচ্ছাবার্তার সঙ্গে ছিল সবুজ ও মেরুন রঙের হৃদয়ের প্রতীক, যা ক্লাবের ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রকাশ করে।
সাংবাদিক নিগ্রহে গ্রেফতার ১৬ জনকে পরিবর্তনের শিকার বলে গান্ধীগিরির পাঠ প্রাক্তন মুসলিম আইপিএসের
১৯১১ সালের সেই আইএফএ শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী ব্রিটিশ দল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট। সেই সময় ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অবহেলা ও তাচ্ছিল্যে ভরা। এমন পরিস্থিতিতে একঝাঁক বাঙালি ফুটবলার, যাঁদের অধিকাংশই খালি পায়ে খেলেছিলেন, সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে মাঠে নেমেছিলেন। তাঁদের সামনে ছিল শুধু একটি ম্যাচ জেতার লক্ষ্য নয়, বরং গোটা জাতির সম্মান রক্ষার দায়িত্ব।
ফাইনালে ওঠার পথটাও সহজ ছিল না। একের পর এক চারটি ব্রিটিশ সামরিক দলকে হারিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে পৌঁছেছিল মোহনবাগান। কিন্তু সাফল্যের পরেও নানা বিদ্রুপ ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল দলকে। অনেকেই মনে করতেন ভারতীয়দের পক্ষে ব্রিটিশদের হারানো অসম্ভব। সেই ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করার মঞ্চ হয়ে ওঠে ২৯ জুলাইয়ের ফাইনাল।
CHESS Plus! স্কুলের বেঞ্চ থেকেই উঠে আসবে আগামী দিনের গ্র্যান্ডমাস্টার!
ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল মোহনবাগান। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ছবিটা। দলের অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী অসাধারণ নৈপুণ্যে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে সমতা ফেরান। এরপর ম্যাচ শেষ হওয়ার অল্প সময় আগে অভিলাষ ঘোষ দুর্দান্ত গোল করে সবুজ-মেরুন শিবিরকে এনে দেন ঐতিহাসিক জয়। ২-১ ব্যবধানে জিতে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আইএফএ শিল্ড জয়ের নজির গড়ে মোহনবাগান।
সেই দলের প্রতিটি ফুটবলারের অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। গোলরক্ষক হীরালাল মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শিবদাস ভাদুড়ী, অভিলাষ ঘোষ, বিজয়দাস ভাদুড়ী, সুধীর চট্টোপাধ্যায় প্রত্যেকেই নিজেদের সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। তাঁদের এই জয় ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে এবং প্রমাণ করে দেয় যে প্রতিভা, সাহস ও ঐক্যের কাছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও পরাস্ত হতে পারে।
এই ঐতিহাসিক জয়ের প্রভাব ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপরও পড়ে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বদেশি চেতনা তখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই সময়ে মোহনবাগানের এই সাফল্য সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করে। কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন বাঙালির গর্ব ও উচ্ছ্বাস।
আজ ১১৫ বছর পরেও মোহনবাগান দিবস শুধু একটি ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বা সাফল্যের স্মরণ নয়। এটি আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম, সাহস এবং জাতীয় গৌরবের প্রতীক। ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক জয় ভারতীয় ফুটবলের ভিত্তিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ে মানুষের মনোবলকে আরও দৃঢ় করেছিল। তাই ২৯ জুলাই এলেই নতুন প্রজন্ম আবারও স্মরণ করে সেই এগারোজন বীর ফুটবলারকে, যাঁদের অদম্য লড়াই ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল এবং মোহনবাগানকে চিরকালীন কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।





