
বিশ্ব বাজারে ভারতীয় কফির চাহিদা(Coffee Export) নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে কফি রফতানিতে ইতিহাস তৈরি করেছে ভারত। সরকারি ও শিল্পসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের কফি রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০৫.৮ কোটি ডলার (২.০৫৮ বিলিয়ন ডলার), যা আগের বছর ২০২৪ সালের ১৬৭.৯ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রফতানির পরিমাণ প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টনে নেমে এলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে কফির দাম বাড়ায় রফতানি আয়ে এই নজিরবিহীন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, ব্রাজিল ও ভিয়েতনামের মতো বড় কফি উৎপাদক দেশে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট কফির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় কফি রফতানিকারকরা বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন। বিশেষ করে আরবিকা ও রোবাস্তা—উভয় জাতের কফির দামই আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালে ভারতের কফি রফতানির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ক্রেতা দেশের তালিকায় পরিবর্তন। বহু বছর ধরে ইতালি ভারতের কফির সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালেও সেই অবস্থান অটুট। তবে দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে রাশিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ায় ভারতের কফি রফতানি প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার পক্ষে ব্রাজিল ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ থেকে কফি আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শূন্যস্থান পূরণে ভারতীয় কফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে।
কফি বোর্ড অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারতীয় কফির গুণমান, ট্রেসেবিলিটি এবং টেকসই চাষ-পদ্ধতির কারণে ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপের বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়ছে। শুধু রাশিয়াই নয়, জার্মানি, বেলজিয়াম, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এবং উত্তর আফ্রিকার বাজারেও ভারতীয় কফির চাহিদা বেড়েছে।
এই সাফল্যের আর্থ-সামাজিক প্রভাবও কম নয়। ভারতে কফি উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে কর্ণাটক থেকে। এছাড়া কেরল ও তামিলনাড়ুও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক রাজ্য। কফি চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ী যুক্ত। রফতানি আয় বাড়ায় এই সব রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও অরণ্য সংলগ্ন এলাকায় কফি চাষ বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে ভারতের কফি রফতানির মূল্য ছিল মাত্র ৮০ কোটি ডলার। এক দশকেরও কম সময়ে সেই অঙ্ক আড়াই গুণের বেশি বেড়ে ২০০ কোটির ঘর ছাড়িয়েছে। কৃষি রফতানিতে বৈচিত্র আনার ক্ষেত্রে কফি ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠছে। চাল, গম বা চায়ের মতো প্রচলিত পণ্যের বাইরে কফি ভারতের কৃষি রফতানি ঝুড়িকে আরও শক্তিশালী করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো সমস্যা কফি চাষিদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গবেষণা, আধুনিক চাষ-পদ্ধতি, মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডেড কফি) এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে জোর না দিলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৫ সালে কফি রফতানিতে রেকর্ড গড়ে ভারত শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ায়নি, বরং বিশ্ব কফি মানচিত্রে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা পেলে ভারতীয় কফি বিশ্ব বাজারে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।










