একবিংশ শতাব্দীতেও যে ভারতের অরণ্যভূমি বিজ্ঞানের কাছে অজানা বিস্ময়ে ভরা, (Nagaland)তার জ্বলন্ত প্রমাণ মিলল নাগাল্যান্ডে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা সংরক্ষিত এক বনাঞ্চলে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন একটি ফুলগাছের প্রজাতি। নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই আবিষ্কার শুধু উদ্ভিদবিদ্যার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভারতের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরেছে।
নাগাল্যান্ডের ফেক জেলার কাভুনহৌ কমিউনিটি রিজার্ভড ফরেস্টে, রাজধানী কোহিমা থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে, উচ্চ পার্বত্য অরণ্যে নিয়মিত উদ্ভিদ সমীক্ষার সময় এই নতুন প্রজাতিটির সন্ধান পান গবেষকরা। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে হোয়া নাগেনসিস। নাগা অঞ্চলের নাম অনুসারেই এই নামকরণ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের জন্য বুধবার দিল্লি যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী
এই গাছটি ‘হোয়া’ গণের অন্তর্গত, যা সাধারণভাবে ‘ওয়াক্স প্ল্যান্ট’ নামে পরিচিত। এই প্রজাতির গাছগুলো তাদের মোমের মতো চকচকে, তারার আকৃতির ফুল এবং দুধের মতো সাদা ল্যাটেক্স নিঃসরণের জন্য পরিচিত। নতুন আবিষ্কৃত হোয়া নাগায়েনসিস গাছটিও একই বৈশিষ্ট্য বহন করে, তবে এর পাতার গঠন ও ফুলের গড়ন একে অন্য সব পরিচিত হোয়া প্রজাতি থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করেছে।
গবেষকদের মতে, এই গাছটি এমন একটি শীতল ও উচ্চ পার্বত্য বনভূমিতে বেড়ে উঠছে, যা এখনও বিজ্ঞানের কাছে প্রায় অনাবিষ্কৃত। যদিও এখনো এই গাছের কোনও চিকিৎসাগত ব্যবহার পরীক্ষিত হয়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দুধজাতীয় ল্যাটেক্স উৎপাদনকারী অনেক উদ্ভিদ অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধি উপাদানের উৎস হয়েছে। সঠিক গবেষণা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে হোয়া নাগায়েনসিসও ফার্মাকোলজির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই গবেষণাটি নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ট আপ প্রজেক্ট ফর ইয়ং ফ্যাকাল্টি প্রকল্পের সহায়তায় সম্পন্ন হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা পত্রিকা Kew Bulletin-এ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই জার্নালটি প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের কিউ বোটানিক্যাল গার্ডেন, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানজনক উদ্ভিদ গবেষণা কেন্দ্র।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ড. ইয়াম বলেন, “এই আবিষ্কার দেখিয়ে দেয় নাগাল্যান্ডের বনাঞ্চলে এখনও কতটা অজানা জীববৈচিত্র্য লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল উচ্চভূমির অরণ্যে অজানা প্রজাতিগুলোকে নথিভুক্ত করা এবং একই সঙ্গে বোঝা যে কমিউনিটি রিজার্ভড ফরেস্ট কীভাবে এই সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে।”
তবে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। গবেষকদের মতে, হোয়া নাগায়েনসিস এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট স্থানে পাওয়া গেছে। এর বিস্তার অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এবং ঝুম চাষ ও বন ধ্বংসের মতো হুমকির কারণে প্রজাতিটিকে অস্থায়ীভাবে Critically Endangered হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষক ভিয়েনেইতে-ও কোজা জানান, “এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটি একটি কমিউনিটি-সংরক্ষিত বন থেকে এসেছে। স্থানীয় নাগা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বনরক্ষা পদ্ধতিই এমন বিরল প্রজাতিকে টিকিয়ে রেখেছে।”
আর এক গবেষক জয়ন্ত পেগু বলেন, “আজ যখন বনাঞ্চলের উপর চাপ বাড়ছে, তখন কাভুনহৌয়ের মতো কমিউনিটি-পরিচালিত বন প্রমাণ করছে যে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।” বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার নাগাল্যান্ডকে আবারও ভারতের অন্যতম জীববৈচিত্র্য হটস্পট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি সংরক্ষণ না করলে হয়তো বহু অমূল্য প্রজাতি বিজ্ঞানের কাছে পরিচিত হওয়ার আগেই চিরতরে হারিয়ে যাবে।




















