কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলতে থাকা টানাপোড়েনের মাঝেই এবার বড় ধাক্কা বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের (Kakoli Ghosh Dastidar)পদত্যাগে। দলের সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে চিঠি লিখে তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। যদিও তিনি সাংসদ পদ ছাড়েননি, তবে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। এমনকি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের কার্যকরী কমিটি থেকেও পদত্যাগ করেছেন তিনি।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগপত্র ঘিরে ইতিমধ্যেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। কারণ শুধু পদত্যাগ নয়, চিঠিতে তিনি একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন দলের অন্দরমহল নিয়ে। তাঁর অভিযোগ, মহিলা সাংসদদের বিরুদ্ধে দলেরই কিছু পুরুষ সাংসদের আচরণ ছিল অত্যন্ত অশালীন এবং সেই বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বের তরফে কার্যত নীরব সমর্থন ছিল। এই অভিযোগ সামনে আসতেই নতুন করে অস্বস্তিতে পড়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব। এছাড়াও শিক্ষা দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি এবং আরজিকরের মত ঘটনার উল্লেখ করে দলকে বিঁধেছেন তিনি।
আরও দেখুনঃডিএ ইস্যুতে শুভেন্দুর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক স্থগিত, বাড়ছে জল্পনা
শুধু তাই নয়, কাকলি তাঁর চিঠিতে দলীয় সংস্কৃতি এবং সংগঠনের বর্তমান অবস্থারও তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দলের মধ্যে ধীরে ধীরে “দুর্নীতি ও অপরাধীকরণ” বেড়ে চলেছে। একসময় যে দল সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছিল, বর্তমানে সেই আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে এসেছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বারাসত জেলায় তৃণমূলের অত্যন্ত খারাপ ফলের নৈতিক দায়ও নিজের কাঁধে নিয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি জানিয়েছেন, সাংগঠনিক প্রধান হিসেবে সেই ব্যর্থতার দায় এড়াতে চান না। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, শুধুমাত্র নির্বাচনী ফল নয়, দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অসন্তোষও তাঁর এই সিদ্ধান্তের পিছনে কাজ করেছে।
বিশেষভাবে তিনি ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাকের ভূমিকাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলের পুরনো এবং পরীক্ষিত কর্মীদের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে আইপ্যাকের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সংগঠনের ক্ষতি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করা নেতাকর্মীরা অসম্মানিত বোধ করছেন বলেও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই অভিযোগ তৃণমূলের অন্দরে বহুদিন ধরেই চাপা অসন্তোষ হিসেবে ঘুরছিল। এবার তা প্রকাশ্যে সামনে এল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এর আগেই তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে চিফ হুইপের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই দলীয় অন্দরে তাঁর অবস্থান নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল। অবশেষে তিনি বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতির পদ থেকেও ইস্তফা দিলেন। ফলে তৃণমূলের অন্দরে ভাঙনের জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগ সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে দিল। একের পর এক কাউন্সিলর, সংগঠক এবং জনপ্রতিনিধিদের পদত্যাগ ইতিমধ্যেই শাসকদলকে চাপে ফেলেছে। তার মধ্যে একজন বর্ষীয়ান সাংসদ প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে এখনও পর্যন্ত কাকলির অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, তাঁর চিঠির বক্তব্য আগামী দিনে দলের অন্দরে আরও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।




















