বাবান আদক, কলকাতা ডেস্ক: যুক্তি আর অঙ্কের নিটোল পৃথিবীতে সময় বড় নিষ্ঠুর এক জাদুকর। সে ইতিহাস মনে রাখে না, মহাকাব্য পড়ে না। গত প্রায় দুই দশক ধরে যে মানুষটা নিজের অদম্য জেদ, পেশির আস্ফালন আর ঘাম দিয়ে ফুটবলের (FIFA World Cup) ব্যাকরণকে নিজের মতো করে লিখেছিলেন, ঘড়ির কাঁটা আজ তাঁকে বুঝিয়ে দিল—মানুষ শেষ পর্যন্ত রক্তমাংসেরই হয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ইউরোপের নিখুঁত ফুটবল মেশিনারিকে যিনি এতকাল নিজের বুটের তলায় শাসন করেছেন, তাঁর শেষবেলার গল্পটা লেখা হলো এক অদ্ভুত বিষন্নতার সুরে।
পর্তুগাল আর স্পেন ইউরোপীয় ফুটবলের দুই বিপরীত ঘরানার লড়াই। একদিকে স্পেনের মেপে পা ফেলা পাসিং ফুটবল, লামিন ইয়ামাল, মিকেল ওয়ারজাবালদের নিরন্তর আক্রমণ। পিছিয়ে ছিল না রোনাল্ডো- ব্রুনো ফার্নান্দেজের পর্তুগালও। প্রথমার্ধের ১২ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিখুঁত পাস থেকে রোনাল্ডোর সেই চেনা শট স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন আটকে দিলেন। হয়তো তখনই লেখা হয়ে গিয়েছিল অমোঘ নিয়তির চিত্রনাট্য। দ্বিতীয়ার্ধেও লড়াই চলল সমানে সমানে। স্প্যানিশ আক্রমণের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ল পর্তুগিজ রক্ষণে, কিন্তু ফাটল ধরল না। ৫৯ মিনিটে রোনাল্ডোর দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।
আরও পড়ুন: ভেঙে গেল জুটি! ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে বিচ্ছেদ ইমামির
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছে, গ্যালারির দমবন্ধ করা অপেক্ষার মাঝখানে নেমে এল সেই নিষ্ঠুর মুহূর্ত। ইনজুরি টাইমের প্রথম মিনিট। স্পেনের ফেরান তোরেসের একটা জ্যামিতিক থ্রু বল, আর বক্সের মাঝখান থেকে মিকেল মেরিনোর বাঁ পায়ের এক শট। বল জড়াল জালে। পর্তুগালের প্রতিরোধের ইস্পাতের ইমারতটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল এক লহমায়।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজল। স্পেন মাতল বন্য উল্লাসে। কিন্তু গোটা বিশ্বের চোখ তখন আটকে মাঠের মাঝে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ৭ নম্বর জার্সিটার ওপর। না, মানুষটার চোখে তখন কোনও আর্দ্রতা ছিল না। কান্নার চেয়েও ভয়ংকর হয় এক নিস্তব্ধ শূন্যতা। সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে থাকা তাঁর ওই স্থির, রিক্ত দৃষ্টিটা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিল, এক বিশাল সাম্রাজ্যের পতন কতটা নিঃশব্দে হয়!
আরও পড়ুন: লোবেরা জামানার ইতি! সবুজ-মেরুনের হট সিটে বসলেন পানাজিওটিস দিলম্পেরিস
সব পেয়েও শেষ অঙ্কে এসে এই না পাওয়ার হাহাকারটুকু নিয়েই হয়তো মহাকাব্যগুলো সম্পূর্ণ হয়। তিনি হাসলেন না, টললেন না, শুধু একবুক নীরবতা দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ভারী করে দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে গেলেন টানেলের অন্ধকারের দিকে। জয়-পরাজয়ের হিসেবের বাইরে এভাবেই লেখা হয়ে গেল এক মহীরুহের বিষণ্ণ প্রস্থান।





