FIFA World Cup: বিশ্বকাপে ৯৯ ফ্রান্সে জন্ম ফুটবলার, ১৩ দেশের জার্সিতে অনন্য নজির

ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ৯৯ ফুটবলার এবার বিশ্বকাপে খেলছেন ১৩টি দেশের হয়ে। অভিবাসন, ইতিহাস ও ফুটবলের অনন্য মেলবন্ধন ঘিরে বাড়ছে আলোচনা।

99-france-born-footballers-playing-for-13-countries-fifa-world-cup-2026

বাবান আদক, কলকাতা: এবারের বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) দলগুলোর তালিকা ঘাঁটলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য! টুর্নামেন্টে এমন ৯৯ জন ফুটবলার খেলছেন, যাঁদের জন্ম ফ্রান্সে। সংখ্যাটা ধারেকাছে অন্য কোনও দেশ নেই। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নেদারল্যান্ডস (৬৭), কিংবা জার্মানি (৫০) বা ইংল্যান্ড (৪৭) যোজন যোজন পিছিয়ে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ৯৯ জন ফরাসি সন্তান যে শুধু ফ্রান্সের হয়ে খেলছেন, তা একেবারেই নয়। ৪৮ দলের এই মেগা টুর্নামেন্টে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন মোট ১৩টি দেশের জার্সিতে। খোদ ফরাসি দলে নিজেদের দেশে জন্ম নেওয়া ২৩ জন ফুটবলার থাকলেও, এরপরই আছে আলজেরিয়া (১৩), হাইতি (১২), কঙ্গো (১১) এবং সেনেগালের (১০) মতো দেশ। স্পেনের মতো দলেও রয়েছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলার।

Also Read | আর্জেন্টিনার এই দাপুটে ফুটবলারকে দলে টানার পথে গোয়া

   

এই পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকিয়ে আছে অবাক করা সব গল্প। বাবা জন্মেছিলেন আলজেরিয়ায়, কিন্তু নিজে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন ফ্রান্সকে নাম তাঁর জিনেদিন জিদান। আর ছেলে লুকা জিদান? তাঁর জন্ম খোদ ফ্রান্সে, কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে তিনি গায়ে চাপিয়েছেন নিজের শেকড়ের দেশ আলজেরিয়ার জার্সি! বাবা ও ছেলের এই বিপরীতমুখী গল্পটাই যেন এবারের বিশ্বকাপের এই অভিনব ‘ফরাসি বিপ্লব’-এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
কিন্তু এমনটা হলো কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় এবং অভিবাসনের মানচিত্রে।

Also Read | ঘানাকে পিছনে ফেলে শেষ ষোলোয় কলম্বিয়া, চোটের কবলে এই ফুটবলার

আফ্রিকার বহু দেশেই একসময় ফরাসি উপনিবেশ ছিল। পরবর্তীকালে সেই সব দেশ স্বাধীন হলেও, উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ওই দেশগুলোর বহু মানুষ ফ্রান্সে পাড়ি জমান এবং সেখানেই স্থায়ী হন। সংস্কৃতির এই মেলবন্ধনের এক অদ্ভুত ছবিও দেখা যায় মাঠে। যেমন, ফ্রান্স বনাম সেনেগাল ম্যাচে সেনেগালের ফুটবলাররা নিজেদের মধ্যে আদি আফ্রিকান ভাষায় কথা বলছিলেন, যাতে ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলের মতো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলাররা তাঁদের কৌশল বুঝতে না পারেন!

একসময় ফুটবলার তৈরির কারখানা বলতে গোটা বিশ্ব চোখ বুজে চিনে নিত ব্রাজিলের সাও পাওলো, আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস বা স্পেনের কাতালুনিয়াকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে নিঃশব্দে সেই সিংহাসন দখল করেছে প্যারিস। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৯ শতাংশ এই শহরে বাস করলেও, দেশের সেরা ফুটবলারদের আঁতুড়ঘর এখন এই প্যারিস শহর ও তার শহরতলি।

Also Read | নয়া মরসুমে কোন দলে খেলবেন ব্রাইসন ফার্নান্দেজ?

ফরাসি ফুটবল সংস্থার টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হুবার্ট ফৌরনিয়ের এই প্রসঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, “এত ছোট এলাকা থেকে এত ফুটবলার উঠে আসা সত্যিই অভাবনীয়।” প্যারিস এবং তার আশপাশে আলজেরিয়া, মরক্কো বা ঘানার মতো দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বাস। গত এক দশকে গড়ে ওঠা এখানকার অজস্র ক্লাবে অনূর্ধ্ব-৬ থেকে অনূর্ধ্ব-১২ স্তরে প্রায় ১৫০০ খুদে ফুটবলার ঘাম ঝরায়। এদের মধ্যে অনেকেই প্রতিভার জোরে ইউরোপের বড় ক্লাবে সুযোগ পায়। বড় হয়ে কেউ খেলার জন্য ফ্রান্সকে বেছে নেয়, কেউ বা শেকড়ের টানে ফিরে যায় পিতৃভূমিতে। ফরাসি জাতীয় দলে শ্বেতাঙ্গের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের আধিক্য এই অভিবাসন চিত্রকেই স্পষ্ট করে।

Also Read | এক লাফে ধুলিসাৎ ২২ বছরের পুরনো রেকর্ড! অ্যাথলেটিক্সে ভারতের নতুন রানির উদয়

আর সেই কারণেই প্যারিসের ‘লা শাপেল’ এলাকার রাস্তায় যখন বড় পর্দায় খেলা চলে, তখন এক অদ্ভুত ম্যাজিক তৈরি হয়। সেখানে ফ্রান্সের দেম্বেলের গোলেও যেমন উৎসবের ঢেউ ওঠে, ঠিক তেমনই সেনেগালের গেয়ির গোলেও সমান উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। দেশ, ভাষা বা রঙের গণ্ডি পেরিয়ে ফুটবল এখানে হয়ে উঠেছে এক সর্বজনীন উৎসবের নাম। আর সেই ফুটবলের হাত ধরেই বিশ্বমঞ্চে রচিত হচ্ছে নতুন যুগের এক ফরাসি বিপ্লব।