শুধু ছবি নয়, দায়িত্বশীল ভ্রমণের ৭ পরামর্শ দিলেন পর্যটন বিশেষজ্ঞরা

অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: একসময় ভ্রমণ মানেই ছিল নতুন জায়গা দেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি জানা এবং পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটানো (Responsible Tourism)। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার…

responsible-tourism-tips-sustainable-travel-expert-advice

অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: একসময় ভ্রমণ মানেই ছিল নতুন জায়গা দেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি জানা এবং পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটানো (Responsible Tourism)। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অনেকেই বেড়াতে যাওয়ার আগে ভাবেন কোথায় সবচেয়ে ভালো ছবি তোলা যাবে, কোন ক্যাফে বা রিসর্ট ‘ইনস্টাগ্রাম-ফ্রেন্ডলি’ কিংবা কোন ভিডিওটি বেশি ভাইরাল হতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্রমণ শুধু ‘চেক-ইন’ বা ছবি পোস্ট করার বিষয় নয়; এটি নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে সমৃদ্ধ করার এক অনন্য সুযোগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ভ্রমণ একজন মানুষকে নতুন কিছু শেখায়। কোনও শহরের ইতিহাস, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয়। বই পড়ে কোনও স্থানের ইতিহাস জানা সম্ভব হলেও, সেই জায়গায় গিয়ে পরিবেশকে নিজের চোখে দেখা ও অনুভব করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই শুধু জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে ছবি তুলে ফিরে না এসে, স্থানীয় সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisements

Also Read | মহাকাল মডেলে গড়ে উঠবে গঙ্গাসাগর? কেন্দ্রের কাছে সহায়তা চাইল ‍‘শুভ-হিন্দু’ সরকার

বর্তমানে ‘রেসপনসিবল ট্যুরিজম’ বা দায়িত্বশীল ভ্রমণের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এর অর্থ এমনভাবে ভ্রমণ করা, যাতে স্থানীয় পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ফেলে না দেওয়া, পর্যটনস্থল পরিষ্কার রাখা, প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় না করা এবং স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা, এসবই একজন সচেতন পর্যটকের দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট এই অভ্যাসই দীর্ঘদিন ধরে কোনও পর্যটনকেন্দ্রকে সুন্দর ও নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে।

স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও পর্যটকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বড় আন্তর্জাতিক হোটেল বা রেস্তোরাঁর বদলে স্থানীয় হোমস্টে, ছোট হোটেল, স্থানীয় খাবারের দোকান বা হস্তশিল্পের বাজারকে বেছে নিলে সেই অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়ে। এতে পর্যটনের আর্থিক সুফল সরাসরি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পী, কারিগর ও ছোট ব্যবসায়ীদেরও উৎসাহ দেওয়া সম্ভব হয়।

Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন ‘পারফেক্ট ছবি’ তোলার ঝুঁকি নিয়ে। বর্তমানে অনেকেই পাহাড়ের কিনারা, নদীর প্রবল স্রোতের ধারে বা নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে ছবি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের মতে, একটি ছবি কখনওই মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়। তাই ভ্রমণের সময় প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে চলা, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ না করা এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের দিকেও এখন অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ব্যবহার, নিজের সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা এবং জল ও বিদ্যুতের অপচয় কমানো, এই ছোট ছোট অভ্যাস পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতন পর্যটকের সংখ্যা যত বাড়বে, জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির উপর পরিবেশগত চাপও তত কমবে।

Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন

মনোবিদদের মতে, ভ্রমণ শুধু বিনোদনের জন্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। কর্মব্যস্ত জীবন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এবং একঘেয়ে রুটিন থেকে কিছুদিনের বিরতি একজন মানুষকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে সাহায্য করে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া মানসিকভাবে সতেজ থাকতে সহায়ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের পর্যটনের মূল মন্ত্র হবে সচেতনতা, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। তাই প্রতিটি সফরকে শুধু ছুটি বা ছবি তোলার সুযোগ হিসেবে নয়, বরং শেখার, জানার এবং নিজেকে সমৃদ্ধ করার একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত।

শেষ পর্যন্ত ভ্রমণের প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে থাকে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সুন্দর ছবি আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু সচেতন ও অর্থবহ ভ্রমণের স্মৃতি আজীবন সঙ্গী হয়ে থাকে।