দীর্ঘায়ুর রহস্য কি জাপানের ‘ইচিজু-সানসাই’ খাদ্যাভ্যাসে? কী বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘ইচিজু-সানসাই’ খাদ্যাভ্যাসে রয়েছে পুষ্টির ভারসাম্য, বৈচিত্র্য ও পরিমিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে।

japan-ichiju-sansai-diet-longevity-health-benefits

অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনের রহস্য খুঁজতে গিয়ে বারবার উঠে আসে জাপানের নাম। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘায়ু জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পরিচিত জাপানে শুধু উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাই নয়, খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেই কারণেই আবারও আলোচনায় এসেছে জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপদ্ধতি ‘ইচিজু-সানসাই’ (Ichiju-Sansai)।

পুষ্টিবিদদের মতে, এটি কোনও দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট নয়। বরং প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখার একটি বহু পুরনো এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে।

কী এই ‘ইচিজু-সানসাই’ (Ichiju Sansai)?

জাপানি শব্দ ‘ইচিজু-সানসাই’-এর অর্থ হলো একটি স্যুপ এবং তিনটি পদ।
এই খাদ্যপদ্ধতিতে সাধারণত একটি খাবারের থালায় থাকে:
• এক বাটি স্যুপ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিসো স্যুপ)
• একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ পদ (মাছ, টোফু বা সয়াবিনজাত খাবার)
• দুটি সবজি বা হালকা সাইড ডিশ
• এক বাটি ভাত
• প্রয়োজনে সামান্য আচার বা ফারমেন্টেড খাবার
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিন্যাসের ফলে একটি খাবার থেকেই শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং খাদ্যআঁশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

কেন এই খাদ্যাভ্যাস জনপ্রিয়?

পুষ্টিবিদদের মতে, একই খাবারে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য উপাদান থাকায় শরীর নানা ধরনের পুষ্টি পায়। একই সঙ্গে কোনও একটি খাবারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও তৈরি হয় না।
এছাড়া এই পদ্ধতিতে বড় প্লেটের পরিবর্তে ছোট ছোট বাটিতে খাবার পরিবেশন করা হয়। ফলে খাবারের বৈচিত্র্য বাড়লেও মোট ক্যালোরি গ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধীরে ধীরে ও মনোযোগ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাসও এই খাদ্যপদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা হজমশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

কী কী খাবারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়?

‘ইচিজু-সানসাই’ খাদ্যাভ্যাসে মৌসুমি ও স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
খাবারের তালিকায় নিয়মিত থাকে:
• তাজা শাকসবজি
• বিভিন্ন ধরনের মাছ
• টোফু
• সয়াবিনজাত খাবার
• সামুদ্রিক শৈবাল
• মিসো স্যুপ
• ফারমেন্টেড খাবার
এসব খাবারে থাকা ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং প্রোবায়োটিক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

Also Read | ঘড়ির বিজ্ঞাপনে প্রায় সবসময়ই ১০:১০ কেন দেখানো হয়? কারণ জানলে অবাক হবেন

ওজন নিয়ন্ত্রণেও কি সাহায্য করে?

গবেষকদের মতে, ছোট পরিমাণে কিন্তু বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ার ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণের সম্ভাবনা কমে।
এর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও তেলের ব্যবহার কম হওয়ায় হৃদ্‌রোগ, স্থূলতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কিছুটা কমতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

কোনও খাবার নিষিদ্ধ নয়

বর্তমানে অনেকেই দ্রুত ওজন কমানোর আশায় কঠোর ডায়েট অনুসরণ করেন বা কিছু খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেন।
কিন্তু ‘ইচিজু-সানসাই’ সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনে বিশ্বাস করে।
এই খাদ্যপদ্ধতিতে কোনও খাবারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয় না। বরং প্রতিদিনের খাবারে সঠিক পরিমাণে শর্করা, প্রোটিন, সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের

শুধু এই ডায়েট মানলেই কি দীর্ঘায়ু নিশ্চিত?

চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য, শুধুমাত্র ‘ইচিজু-সানসাই’ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলেই দীর্ঘ জীবন নিশ্চিত হবে, এমন দাবি করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের উপর। যেমন:
• নিয়মিত শরীরচর্চা
• পর্যাপ্ত ঘুম
• মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
• ধূমপান থেকে বিরত থাকা
• অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো
• সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই খাদ্যপদ্ধতির মূল শিক্ষা হলো পরিমিতি, বৈচিত্র্য এবং পুষ্টির ভারসাম্য। জাপানি খাবার হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও এই নীতিগুলি দৈনন্দিন জীবনে মেনে চললে সুস্থ জীবনযাপনের পথে অনেকটাই এগিয়ে থাকা সম্ভব।