কলকাতা: জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে দেশের বর্ষার ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তবে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলেও পশ্চিমবঙ্গ এ বছর সেই প্রবণতার ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে। Climate Trends-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ব ভারতে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে বর্ষা প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।
২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছিল সম্ভাব্য Super El Niño-র আশঙ্কার মধ্যে। সেই কারণে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) জুলাই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বর্ষা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ২৩৮.২ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক পরিমাণ ২৩৩.৯ মিমি। জুনের শেষে যেখানে সারা দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৪০ শতাংশ, তা ২৯ জুলাই নাগাদ কমে ১৬ শতাংশে নেমে আসে।
IMD-র ৩০ জুলাই পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ৭০৩.৫ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৬৯১.৫ মিমি। অর্থাৎ, রাজ্যে প্রায় ২ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে।
তবে জেলার ভিত্তিতে চিত্র একরকম নয়। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং এবং মালদহে স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর দিনাজপুরে ২৭ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
Also Read | IIEST শিবপুরে ৪.৪ একরের নেচার স্টাডি পার্ক, থাকছে বাটারফ্লাই গার্ডেন থেকে ওপেন-এয়ার জিম
দক্ষিণবঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরে ৪২ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৪৫ শতাংশ এবং উত্তর ২৪ পরগনায় ২৮ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে। কলকাতায় এ পর্যন্ত ৬৯৫.৮ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক পরিমাণ ৬৫৮.৩ মিমি, অর্থাৎ শহরে ৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বীরভূম (-৩৩%), মুর্শিদাবাদ (-৩২%), পুরুলিয়া (-৩৩%) এবং নদিয়া (-২২%) জেলায় এখনও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
প্রাক্তন IMD মহাপরিচালক কে. জে. রমেশ জানান, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা El Niño-র প্রভাবকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে তৈরি হওয়া একের পর এক আবহাওয়া ব্যবস্থা বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে, যার ফলে পূর্ব ও মধ্য ভারতে বর্ষা সক্রিয় হয়েছে।
Also Read | তিনটি মার্কশিটই জাল! NEET পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ হাইকোর্টের
অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং-এর আবহাওয়াবিদ অক্ষয় দেওরাস বলেন, ভারত মহাসাগরের Indian Ocean Dipole (IOD) বা Madden-Julian Oscillation (MJO)-এর বিশেষ সহায়ক অবস্থা না থাকলেও বর্ষা এবার নিজস্ব গতিতেই সক্রিয় থেকেছে। তাঁর মতে, স্থলভাগ ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়েছে, যা স্বল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ানমার হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করা একাধিক নিম্নচাপ পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব ভারতের সামগ্রিক বৃষ্টির ঘাটতি থেকে অনেকটাই রক্ষা করেছে।
তবে বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা, মোট বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও বর্ষার ধরন বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে শহরে জল জমা, নদীর বন্যা, হিমালয় অঞ্চলে ধস এবং কৃষিক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ নয়, কখন, কোথায় এবং কতটা তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে, সেটাই বর্ষার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করছে।





