মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক অভাবনীয় ধাক্কা। কাতারে অবস্থিত আমেরিকার প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম’ (Early Warning Radar System) ধ্বংস করল ইরান। এই হামলার জেরে ওই অঞ্চলে আমেরিকার মিসাইল ডিফেন্স বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ‘অন্ধ’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা মার্কিন বাহিনীকে সম্ভাব্য মিসাইল হামলার মুখে চূড়ান্ত বিপাকে ফেলতে পারে।
উপগ্রহ চিত্রে স্পষ্ট ক্ষতির ছবি
প্ল্যানেট ল্যাবস (Planet Labs)-এর উপগ্রহ চিত্রে কাতারে মার্কিন স্পেস ফোর্সের ‘AN/FPS-132 (Block 5) ব্যালিস্টিক মিসাইল আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম’-এর আশেপাশে ব্যাপক ক্ষতি এবং আগুন নেভানোর চেষ্টার ছবি ধরা পড়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরিচালিত সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাডার সিস্টেম।
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এটিকে একটি “নির্ভুল মিসাইল হামলা” (precision missile strike) বলে দাবি করেছে। তবে অন্যান্য সূত্রের মতে, একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ও ড্রোনের হামলার ফাঁক গলে একটি কম খরচের ‘শাহেদ’ (Shahed) ড্রোন আমেরিকার দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে এই রাডারে আঘাত হেনে থাকতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই রাডার সিস্টেম? Iran attack US radar Qatar
আপগ্রেডেড আর্লি ওয়ার্নিং রাডার (UEWR) প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ‘রেথিয়ন’ (Raytheon)-এর তৈরি এই সিস্টেমটির ক্ষমতা ও ব্যাপ্তি বিশাল৷ এই রাডার ৫,০০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আকাশপথের যেকোনো হুমকি শনাক্ত করতে পারে। কাতার থেকে এটি ইরান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, মধ্য এশিয়ার কিছু অংশ এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত নজরদারি চালাতে সক্ষম।
এই রাডারটি আমেরিকার THAAD, প্যাট্রিয়ট (Patriot) মিসাইল ব্যাটারি এবং এজিস (Aegis) যুদ্ধজাহাজের মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শত্রুপক্ষের মিসাইল হামলার খবর কয়েক মিনিট আগেই এই রাডার মার্কিন বাহিনীকে জানিয়ে দেয়, যা সফলভাবে মিসাইল ধ্বংস করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
এই রাডার ধ্বংসের কৌশলগত পরিণতি যে কতটা মারাত্মক, তা নিয়ে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
পেন্টাগনের প্রাক্তন উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর সোশ্যাল মিডিয়া এক্স (X)-এ এই বিপর্যয়ের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে লিখেছেন, “ওরা (ইরান) আমেরিকার চোখ খুবলে নিয়েছে।”
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান অ্যালেন এই রাডারটিকে “উপসাগরীয় অঞ্চলে সমস্ত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মেরুদণ্ড” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এর ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখন ‘অন্ধ’ হয়ে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, আধুনিক যুদ্ধে আক্রমণকারীকে শুধু একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে হয়, কিন্তু রক্ষাকারীকে সবদিক সামলাতে হয়, এই হামলা তারই প্রমাণ।
কৌশলগত ও আর্থিক ধাক্কা
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার হাতে স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য সেন্সরের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক থাকলেও, AN/FPS-132-এর মতো বিশাল এবং স্থায়ী রাডার খুব দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কার্যত অসম্ভব। ফলে ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের রুটগুলিতে নজরদারির বড় ঘাটতি তৈরি হলো।
আর্থিক দিক থেকেও এটি এক বিরাট ক্ষতি। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে এটিই সবচেয়ে দামি মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম (১.১ বিলিয়ন ডলার) যা ধ্বংস হলো। এই রাডার বিকল হওয়ায় থাড (THAAD) এবং প্যাট্রিয়টের মতো সিস্টেমগুলোর সমন্বয়ে বড়সড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, আমেরিকার অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল স্নায়ুকেন্দ্রগুলিতে নিখুঁত আঘাত হানার ক্ষমতা ইরানের রয়েছে।




















