রাত জেগে কাজ করছেন? ঘুমের অভাবে বাড়তে পারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদ

রাত জাগা ও কম ঘুমের অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ জেনে নিন।

sleep-deprivation-increases-risk-of-diabetes-heart-disease-and-depression

অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: বর্তমানের ব্যস্ত জীবন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অনিয়মিত রুটিনের কারণে পর্যাপ্ত ঘুম অনেকের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, দিনে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস শরীর ও মনের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। এই সময় শরীর নিজেকে পুনর্গঠন করে, মস্তিষ্ক সারাদিনের তথ্য সংরক্ষণ করে এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলি ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।

Advertisements

ঘুমের ঘাটতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শরীরে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন)-এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত কম ঘুমের অভ্যাস ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শুধু ডায়াবেটিস নয়, হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতার ক্ষেত্রেও ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

ঘুমের অভাবের প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়, বিরক্তি বাড়ে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ (ডিপ্রেশন) এবং স্মৃতিশক্তির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে এসেছে ‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’। সারাদিনের কাজের পরে নিজের জন্য সময় বের করতে অনেকেই রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করেন, সামাজিক মাধ্যম স্ক্রল করেন বা ওয়েব সিরিজ দেখেন। এর ফলে ঘুমানোর সময় আরও পিছিয়ে যায় এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি (Body Clock) বিঘ্নিত হয়। ফলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকলেও ঘুমের মান কমে যায় এবং সকালে উঠে ক্লান্তি অনুভূত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের জন্য ওষুধের চেয়ে জীবনযাত্রার কিছু সহজ পরিবর্তনই বেশি কার্যকর। যেমন
• প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা।
• শোয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহার কমানো।
• সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা।
• রাতে খুব ভারী খাবার না খাওয়া।
• শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা।

নিয়মিত শরীরচর্চাও ভালো ঘুমের অন্যতম চাবিকাঠি। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো। পাশাপাশি যোগব্যায়াম, মেডিটেশন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন মানসিক চাপ কমিয়ে ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মজীবনের সাফল্য, পড়াশোনায় মনোযোগ, মানসিক স্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি হলো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও ঘুমকে অবহেলা না করে দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সতর্কতা: ঘুমের সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, নাক ডাকার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দিনের ঘুমঘুম ভাব বা অনিদ্রার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Also Read |  পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব

Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা

Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন

Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের