নয়াদিল্লি: দীর্ঘ ১২ বছর ধরে শয্যাশায়ী, চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও আশাই নেই। এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে ৩২ বছর বয়সি এক যুবকের ক্ষেত্রে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ (Passive Euthanasia) বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৮ সালে পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা জারির পর, সেই নির্দেশিকা সরাসরি প্রয়োগ করে লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়ার আইনি অনুমতি দেওয়ার এটাই দেশের প্রথম ঘটনা।
কী হয়েছিল হরিশ রানার?
৩২ বছর বয়সি হরিশ রানা তাঁর পেয়িং গেস্টের চার তলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পান। এই দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’ (Persistent Vegetative State) বা কোমায় আচ্ছন্ন হন৷ তাঁর শরীর ১০০ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (quadriplegia) হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। পেটে বসানো টিউবের মাধ্যমে চিকিৎসকদের দেওয়া তরল খাবার দিয়েই তাঁকে এতদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায় Passive Euthanasia Supreme Court India
বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথনের বেঞ্চ বুধবার এই ঐতিহাসিক নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, টিউবের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পুষ্টি প্রদান করাও একধরনের ‘চিকিৎসা’। যেহেতু এই চিকিৎসায় রোগীর অবস্থার কোনও উন্নতি হচ্ছে না, বরং শুধুমাত্র তাঁর যন্ত্রণাদায়ক অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, তাই রোগীর স্বার্থেই এই লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহার করা যেতে পারে। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট এবং রোগীর পরিবারের সম্মতির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এইমসকে (AIIMS) আদালতের নির্দেশ
আদালত নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সকে (AIIMS) নির্দেশ দিয়েছে, ওই রোগীকে যেন বাড়ি থেকে এনে তাদের প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানেই অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এবং নির্দিষ্ট পরিকাঠামো মেনে তাঁর লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য আদালতের গাইডলাইন
এই রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাও বেঁধে দিয়েছে৷ আদালত জানিয়েছে, এরপর থেকে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ড যদি লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়ার শংসাপত্র বা ছাড়পত্র দেয়, তবে সাধারণত আইনি হস্তক্ষেপের আর প্রয়োজন হবে না। এটি যেহেতু নির্দেশিকা জারির পর প্রথম ঘটনা, তাই বিষয়টি আদালতের সামনে আনা হয়েছিল।
‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক আইন প্রণয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকেও ভাবনাচিন্তা করার পরামর্শ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
বাবার দীর্ঘ আইনি লড়াই
ছেলের এই মর্মান্তিক অবস্থার অবসান চেয়ে প্রথমে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরিশের বাবা। কিন্তু হাইকোর্ট মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের আর্জি খারিজ করে দেয়। এরপর ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে যান তিনি। প্রথমে আর্জি মঞ্জুর না হলেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে উত্তরপ্রদেশ সরকার রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু সম্প্রতি ছেলের অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় এবং কোনও চিকিৎসায় সাড়া না মেলায় ফের শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন অসহায় বাবা। এরপরই এইমসের সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে এই ঐতিহাসিক রায় দেয় আদালত।



















