ঢাকা: জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (Jamaat chief)আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, “ধর্ম নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমার দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে কিছু নেই। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, এবং ভারত আমাদের কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ হিসেবেই থাকবে। আমি কাউকে সংখ্যালঘু বলে মনে করি না আমরা সবাই বাংলাদেশি, সবাই প্রথম শ্রেণির নাগরিক। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্ঠের বিভাজন আমরা সমর্থন করি না।”
ভোটের আগে জামায়াত প্রধানের এই মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, সম্পত্তি সুরক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বা ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ নতুন নয়। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতার মুখে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নেই’ এই বার্তা অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
রাতপোহালেই নির্বাচন! তার আগেই কলকাতায় আত্মঘাতী হামলার হুমকি মৌলানার
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে নাগরিকত্বের সমানাধিকারের প্রশ্ন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের কাছে সকল নাগরিক সমান। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ, যেখানে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন।
ভারতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা কারণে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের স্বার্থেই জরুরি। এই সম্পর্ক অগ্রাধিকার পাবে।” দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, নদীর জল বণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো একাধিক ইস্যু রয়েছে। ভোটের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, জামায়াতের এই অবস্থান ভোটের আগে আন্তর্জাতিক মহল এবং প্রতিবেশী দেশের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রচেষ্টা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে উদ্বেগ মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, তার প্রেক্ষিতে এই বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে সমালোচকদের মতে, শুধু বক্তব্য নয় বাস্তব পদক্ষেপই হবে আসল পরীক্ষা। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি সুরক্ষা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এসব ক্ষেত্রেই কার্যকর নীতি প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ কতটা জোরদার হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রসঙ্গেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাঝে মাঝে সীমান্ত ইস্যু, বাণিজ্য ঘাটতি বা রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে টানাপোড়েন দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে জামায়াত প্রধানের ইতিবাচক মন্তব্য ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলি যখন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে, তখন জামায়াতের এই বার্তা ভোটারদের একাংশের কাছে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে ‘সবাই প্রথম শ্রেণির নাগরিক’ এই স্লোগান কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ভোটের মুখে এই মন্তব্য রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে প্রতিবেশী ভারতের প্রতি অগ্রাধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক অধিকারের বার্তা দুই মিলিয়ে জামায়াত প্রধানের বক্তব্য যে নির্বাচনী আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।




















