মিশন অনন্যা’: ৭০ হাজার মেয়েকে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, নজির বীরভূম পুলিশ কনস্টেবলের

বীরভূম: পুলিশের পোশাক গায়ে থাকলেও তাঁর পরিচয় শুধু আইনরক্ষক হিসেবে নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মেয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছেন তিনি। ধর্ষণ,…

mission-ananya-birbhum-police-constable-trained-70000-girls-self-defence

বীরভূম: পুলিশের পোশাক গায়ে থাকলেও তাঁর পরিচয় শুধু আইনরক্ষক হিসেবে নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মেয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছেন তিনি। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি কিংবা যেকোনও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে যাতে মেয়েরা নিজেদের রক্ষা করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ‘মিশন অনন্যা’-র মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার মেয়েকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মার্শাল আর্ট ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বীরভূমের পুলিশ কনস্টেবল কৌশভ সান্যাল।

নির্ভয়া ও কামদুনি কাণ্ড থেকেই শুরু পথচলা

কৌশভ সান্যাল বর্তমানে ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার ফোর্স (NVF)-এর বীরভূম জেলা ব্যাটালিয়নে কর্মরত। তিনি জানান, দিল্লির নির্ভয়া গণধর্ষণ এবং পশ্চিমবঙ্গের কামদুনি গণধর্ষণ-এর ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এরপরই ২০১৫ সালে তিনি শুরু করেন ‘মিশন অনন্যা’, যার মূল লক্ষ্য মেয়েদের আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা।

Also Read | টাকিতে ইছামতীর জমি দখল করে হোটেল! বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিল সরকার

৭০ হাজারের বেশি মেয়েকে প্রশিক্ষণ

গত ১০ বছরে বীরভূমের পাশাপাশি বর্ধমান, হুগলি, এমনকি দিল্লি ও ঝাড়খণ্ড-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে তিনি স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মেয়ে তাঁর কাছ থেকে আত্মরক্ষার কৌশল শিখেছেন।

কী শেখানো হয়?

কৌশভ সান্যালের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয় বাস্তব পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার কৌশলের উপর।
প্রশিক্ষণে শেখানো হয়
• হঠাৎ আক্রমণের মুখে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন।
• কেউ জোর করে ধরে ফেললে কীভাবে মুক্ত হবেন।
• হাতের কাছে থাকা সাধারণ জিনিসকে কীভাবে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
• বিপদের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল।
তিনি জানান, স্কুলের সময় অনুযায়ী কোথাও একদিন, কোথাও তিনদিন ধরে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

Also Read | ডানকুনি পুরসভায় ভাঙল তৃণমূল বোর্ড, চেয়ারম্যান-সহ চারজনের ইস্তফায় চাঞ্চল্য

শান্তিনিকেতনে বিনামূল্যে ক্যারাটে ক্লাস

শুধু স্কুল-কলেজ নয়, শান্তিনিকেতন এলাকায় তিনি নিয়মিত বিনামূল্যে ক্যারাটে ক্লাস পরিচালনা করেন।
সেখানে ছেলে ও মেয়ে—উভয়েই প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণের জন্য তিনি কোনও ফি নেন না।

মার্শাল আর্টই তাঁর জীবন

মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে মার্শাল আর্ট শেখা শুরু করেন কৌশভ সান্যাল।
ক্যারাটের পাশাপাশি তিনি দক্ষ,
• জুডো
• তায়কোয়ান্ডো
• কুংফু
• জিমন্যাস্টিক্স
৪৮ বছর বয়সেও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের ফিটনেস বজায় রেখেছেন। ডিউটির ফাঁকেও তিনি পৌঁছে যান স্কুল-কলেজে, শুধুমাত্র আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন

নারী সুরক্ষায় তাঁর এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি পেয়েছেন,
• National Changemakers Award 2025 (গুজরাট)
• Chetan Chauhan Unsung Hero Sports Coach Award (দিল্লি)
এছাড়াও তাঁর জীবন ও কাজের উপর একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছে Hero MotoCorp।

‘যুদ্ধে কোনও নিয়ম নেই’

কৌশভ সান্যালের মতে, শুধুমাত্র প্রতিযোগিতায় পদক জেতার জন্য মার্শাল আর্ট শেখা যথেষ্ট নয়।
তাঁর কথায়, বাস্তব বিপদের সময় আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন কার্যকর যুদ্ধকৌশল। তাই তিনি ছাত্রীদের বারবার একটি কথাই বলেন, “যুদ্ধে কোনও নিয়ম নেই। বিপদের সময় নিজের জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”

স্কুলে প্রশংসিত প্রশিক্ষণ

সম্প্রতি ১৬ জুলাই বীরভূমের কীর্নাহার বালিকা বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ ছাত্রীকে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেন কৌশভ সান্যাল।
বিদ্যালয়ের টিচার-ইন-চার্জ দিল আফরোজ খাতুন বলেন, এই ধরনের প্রশিক্ষণ বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং ছাত্রীরা উৎসাহের সঙ্গে অংশ নিয়েছে।

অন্য শিক্ষিকা সঙ্গীতা মাঝি ঘোষ-এর মতে, সব বয়সের নারীরই আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। কৌশভ সান্যাল যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সমাজের সকলের সমর্থন পাওয়া উচিত।

নারী সুরক্ষার বার্তা

কৌশভ সান্যালের ‘মিশন অনন্যা’ আজ শুধু একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প নয়, বরং নারী আত্মরক্ষা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তাঁর লক্ষ্য একটাই—প্রতিটি মেয়ে যেন বিপদের মুহূর্তে অসহায় না থেকে নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করতে পারে।