ফাইনালের আগে বিপাকে আর্জেন্টিনা! ফকল্যান্ড ব্যানার ঘিরে ফিফার শাস্তির আশঙ্কা

বিট্টু দত্ত, কলকাতা ডেস্ক: ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই ফুটবলের বাইরে আরও অনেক ইতিহাস, আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) সেমিফাইনালে দুই দলের লড়াইও তার…

argentina-faces-fifa-action-over-falklands-malvinas-banner-after-england-win

বিট্টু দত্ত, কলকাতা ডেস্ক: ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই ফুটবলের বাইরে আরও অনেক ইতিহাস, আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) সেমিফাইনালে দুই দলের লড়াইও তার ব্যতিক্রম ছিল না। মাঠে ২২ জন ফুটবলারের ৯০ মিনিটের লড়াই শেষ হলেও বিতর্কের শুরু হয় ম্যাচের পর। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার আনন্দ উদ্‌যাপনের মাঝেই ফকল্যান্ড (Falklands) বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বার্তা-সম্বলিত একটি ব্যানার হাতে মাঠে নামেন আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার। আর সেই ঘটনাই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি ও তর্কাতর্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম আর্জেন্টিনার ভ্যালেন্টিন বার্কোর সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই জিয়োভানি লো সেলসো, নিকোলাস ওটামেন্ডিসহ কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার একটি ব্যানার হাতে উদ্‌যাপন শুরু করেন। সেখানে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল, “লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস”, যার অর্থ “মালভিনাস আর্জেন্টিনারই।” শুধু মাঠেই নয়, গ্যালারিতেও একই ধরনের পোস্টার দেখা যায় এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা একই স্লোগান দিতে থাকেন।

আরও পড়ুন: পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা আর্জেন্টিনায় মালভিনাস নামে পরিচিত, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। দ্বীপটি আর্জেন্টিনার উপকূলের কাছাকাছি হলেও ১৮৩৩ সাল থেকে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বরাবরই দাবি করে এসেছে যে দ্বীপপুঞ্জটি তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ। এই মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধই ১৯৮২ সালে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।

সে সময় আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড গালতিয়েরির নির্দেশে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সেনা পাঠায়। জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বিশাল নৌবহর, যুদ্ধবিমান ও সেনা মোতায়েন করেন। টানা ৭৪ দিনের সংঘর্ষের পর আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের হাতেই থেকে যায়। সেই যুদ্ধে প্রায় ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনার মৃত্যু হয়, যা দুই দেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপে প্রথমবার সেমিফাইনালে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলের মহারণ

এই যুদ্ধের প্রভাব ফুটবল মাঠেও দেখা গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো মারাদোনার দুটি গোল আজও কিংবদন্তি। একটি ছিল বিতর্কিত “হ্যান্ড অব গড” এবং অন্যটি ছিল ছয়জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা দুর্দান্ত গোল, যা অনেকের মতে ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোল। সেই ম্যাচকে অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতীকী জবাব হিসেবেও দেখেছিলেন।

চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই ঐতিহাসিক বিরোধ যে এখনও দুই দেশের মানুষের আবেগে জড়িয়ে রয়েছে, তারই প্রমাণ মিলল এবারের বিশ্বকাপে। তবে এই উদ্‌যাপন আর্জেন্টিনার জন্য সমস্যার কারণও হতে পারে। ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ম্যাচে রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী ব্যানার, পোস্টার বা স্লোগান প্রদর্শন নিষিদ্ধ। তাই ম্যাচ-পরবর্তী এই ঘটনায় আর্জেন্টিনা ফুটবল দল বা সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখন নজর ফিফার সিদ্ধান্তের দিকে। সংস্থা এই ঘটনাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয় কি না, সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।