God Particle Discovery: ৪ঠা জুলাই তারিখটি ইতিহাসে নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে আছে, তবে বিজ্ঞানের জগতে দিনটির গুরুত্ব দীপাবলি বা ঈদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ঠিক এই দিনটিতেই—২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই—বিশ্বের বৃহত্তম গবেষণা কেন্দ্র ‘সার্ন’ (CERN)-এর বিজ্ঞানীরা এমন এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছিলেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। তাঁরা দাবি করেন যে, তাঁরা মহাবিশ্বের অন্যতম এক গভীর রহস্য—’গড পার্টিকেল’ (God Particle) বা ‘ঈশ্বর কণা’—আবিষ্কার করেছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে বিজ্ঞানীরা বস্তুর ওজনের প্রকৃত উৎস বা রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছিলেন। কয়েক দশকের গবেষণার পর তাঁরা এমন এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেন, যা বিজ্ঞানের জগতকে চিরতরে বদলে দেয়। ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালের ৪ জুলাই, সুইজারল্যান্ডের সার্ন (CERN)-এর শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা ‘গড পার্টিকেল’ বা ‘হিগস বোসন’ কণা আবিষ্কারের ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আকর্ষণীয় নাম হওয়া সত্ত্বেও এটি সেই কণা নয় যা প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিল? বরং এটি এমন একটি কণা, যা ছাড়া মহাবিশ্বের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না।
এর নাম কেন ‘গড পার্টিকেল’ (God Particle) রাখা হয়েছিল?
হিগস বোসন আসলে হিগস ক্ষেত্রের (Higgs field) সাথে সম্পর্কিত একটি অতি ক্ষুদ্র কণা। হিগস ক্ষেত্র হলো একটি অদৃশ্য শক্তির ক্ষেত্র যা সমগ্র মহাজগৎ জুড়ে বিস্তৃত। পদার্থবিজ্ঞানের ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ অনুযায়ী, কোনো কণা যখন এই ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেটি ভর লাভ করে। কোনো কণা এই ক্ষেত্রের সাথে যত বেশি মিথস্ক্রিয়া করে, সেটি তত বেশি ভারী হয়ে ওঠে।
হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব না থাকলে কী হতো?
এই ক্ষেত্রটি না থাকলে মহাবিশ্বের কোনো কণা একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারত না। সবকিছুই আলোর গতিতে ছুটে চলত। কোনো পরমাণু গঠিত হতো না, কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের সৃষ্টি হতো না এবং মানুষের জীবনেরও কখনোই সূচনা হতে পারত না।
সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয়টি হলো, এই কণাটির নাম “গড পার্টিকেল” (God Particle) কোনো বিজ্ঞানী দেননি। ১৯৯৩ সালে নোবেলজয়ী লিওন লেডারম্যান এটি নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন; বইটির বিক্রি বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকাশক এর নাম দেন “গড পার্টিকেল”। অথচ লেডারম্যান আসলে এর নাম রাখতে চেয়েছিলেন “গডড্যাম পার্টিকেল” (Goddamn Particle)—যার মাধ্যমে তিনি কণাটি খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রচণ্ড জটিলতা ও কাঠিন্য রয়েছে, তা-ই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তবে কারও কারও মতে, প্রকাশকের মুদ্রণজনিত ভুলের কারণেই নামটা “গডড্যাম পার্টিকেল” থেকে বদলে “গড পার্টিকেল”-এ পরিণত হয়েছিল।
এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি কীভাবে সম্ভব হলো?
এই অদৃশ্য কণাটি আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীদের মাটির নিচে বিশ্বের বৃহত্তম যন্ত্র—’লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার’—তৈরি করতে হয়েছিল। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে অবস্থিত এই যন্ত্রটি প্রোটন কণাকে আলোর গতিতে ত্বরান্বিত করে একে অপরের সাথে প্রচণ্ড বেগে সংঘর্ষ ঘটাত।
হিগস বোসন কণাটি সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ সময় টিকে থাকে এবং এরপরই দ্রুত অন্যান্য কণায় রূপান্তরিত বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে বিজ্ঞানীরা এটিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি; বরং এর ক্ষয়ের পর অবশিষ্ট যে চিহ্ন বা সংকেত পাওয়া গিয়েছিল, তার মাধ্যমেই এটিকে শনাক্ত করা হয়েছিল। ২০১২ সালের ৪ জুলাই এই আবিষ্কারটি নিশ্চিত করা হয় এবং এর জন্য ২০১৩ সালে পিটার হিগস ও ফ্রাঁসোয়া এংলার্টকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।


