
পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মাঝেই এবার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী পদ নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।(Sanjeev Sanyal) অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যালকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এখন তুমুল আলোচনা। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকারে শক্তিশালী অর্থনৈতিক মুখের অভাব রয়েছে বলে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার মাঝেই সঞ্জীব সান্যালের নাম সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে সম্ভাব্য অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
৪ মে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল প্রকাশের দিন সঞ্জীব সান্যালের একটি রহস্যময় সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নতুন করে জল্পনা বাড়িয়ে দেয়। তিনি লিখেছিলেন, “The Dark One, Goddess of Time, turns the Wheel of Epochs, slows but surely।” অনেকেই এই পোস্টকে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি হয়তো তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকারও আভাস ছিল।
আরও দেখুনঃ শুভেন্দু ঘনিষ্ঠের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে হুমকি! পাঁশকুড়ায় ধৃত ৪ তৃণমূল নেতা
বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই অর্থ দফতরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরও তাঁর অধীনে রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের অর্থনীতি সামলানোর জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেই মনে করছে বিজেপির একাংশ। সেই কারণেই সঞ্জীব সান্যালের নাম সামনে আসছে বারবার।
সঞ্জীব সান্যালের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের পূর্ণকালীন সদস্য। এর আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনৈতিক সমীক্ষার একাধিক সংস্করণ তৈরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।
কলকাতায় জন্ম নেওয়া সঞ্জীব সান্যালের সঙ্গে বাংলার যোগও গভীর। সেন্ট জেভিয়ার্স ও সেন্ট জেমস স্কুলে পড়াশোনার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি দিল্লিতে যান এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রোডস স্কলার হিসেবে পড়াশোনা করেন। ফলে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে আরও একটি জল্পনা চলছে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে দেওয়ার পর সেখানে উপনির্বাচনে সঞ্জীব সান্যালকে প্রার্থী করা হতে পারে। নন্দীগ্রামকে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয় এবং শুভেন্দুর ব্যক্তিগত প্রভাবও সেখানে যথেষ্ট। ফলে সেখান থেকে জিতে এসে সঞ্জীব সান্যাল মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করতে পারেন বলেই মনে করছেন অনেকে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী পদ নিয়ে আরেকটি নামও আলোচনায় রয়েছে অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ী। তবে তাঁকে ইতিমধ্যেই নীতি আয়োগের সহ-সভাপতি করা হয়েছে বলে আপাতত তাঁর রাজ্য রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিও নতুন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় দেশের অন্যতম শিল্পোন্নত রাজ্য হলেও গত কয়েক দশকে শিল্পের অবনতি, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে রাজ্যের অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছে। সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প বাতিল হওয়া এখনও বাংলার শিল্প ইতিহাসে বড় ঘটনা হিসেবে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে বাংলার অংশীদারিত্ব ক্রমশ কমছে। একসময় যা ১০ শতাংশের বেশি ছিল, এখন তা অনেকটাই নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয়ও জাতীয় গড়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিল্পে বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা।

