বদলাল শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ! দুবাইয়ের কর্পোরেট জীবন ছেড়ে সুন্দরবনে স্কুল গড়লেন সুইস নারী

দুবাইয়ের কর্পোরেট জীবন ছেড়ে সাগর দ্বীপের গ্রামে বিনামূল্যে স্কুল গড়েছেন সুইস নাগরিক স্যান্ড্রা লাভি গইকোভিচ। শিক্ষার আলো পৌঁছেছে শতাধিক শিশুর জীবনে।

Inspiring Story sandra-lavie-gojkovic-free-school-sagar-island-west-bengal

Inspiring Story: অনেকের কাছে সফল জীবনের মানে ভালো চাকরি, মোটা বেতন, বিদেশে বিলাসবহুল জীবন আর আর্থিক নিরাপত্তা। কিন্তু স্যান্ড্রা লাভি গইকোভিচ (Sandra Lavie Gojkovic) সেই জীবন ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ। সুইজারল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এবং দুবাইয়ে কর্পোরেট চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এই সুইস নারী আজ পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপের এক প্রত্যন্ত গ্রামে শতাধিক শিশুর শিক্ষার আলো জ্বালানোর কাজ করছেন।

প্রায় ১৫ বছর আগে নেওয়া তাঁর একটি সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে বহু শিশু, নারী এবং পরিবারের ভবিষ্যৎও।

Advertisements

একটি প্রশ্নই বদলে দিয়েছিল জীবন

স্যান্ড্রার কথায়, দুবাইয়ে কর্পোরেট জীবনে তাঁর কোনও অভাব ছিল না। ভালো চাকরি, সুন্দর বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, আর্থিক স্বচ্ছলতা, সবই ছিল। কিন্তু একটি প্রশ্ন তাঁকে বারবার ভাবিয়ে তুলত। “আমার জীবনে এত কিছু রয়েছে, অথচ এত মানুষের কাছে কেন মৌলিক সুযোগও নেই?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি চাকরি ছেড়ে ভারতে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

Red More: ঝাড়গ্রামে সিআইএসএফ-এর গুলিতে জখম দুই বালি খাদান কর্মী, শুরু তদন্ত

প্রায় কিছুই সঙ্গে আনেননি

স্যান্ড্রা জানান, চাকরি ছাড়ার পর তিনি খুব অল্প কিছু জিনিস নিয়েই ভারতে চলে আসেন। তাঁর কথায়, সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি শার্ট, দুটি প্যান্ট এবং একমুখী বিমানের টিকিট। তিনি একাই ট্রেনে চেপে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরেছেন। কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, ছিল না পরিচিত মানুষের নিরাপত্তাও। তাঁর মতে, ভারতের সরল জীবনযাপনই তাঁকে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

শহর নয়, পরিবর্তনের শুরু গ্রামের মাটি থেকে

প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে অর্থসাহায্য করলেই হয়তো সমাজের পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। তখনই তিনি নিজেই একটি স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সময় তিনি উপলব্ধি করেন, প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হওয়া উচিত গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে।

সাগর দ্বীপেই শুরু নতুন পথচলা

স্থানীয় মানুষের পরামর্শে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপে পৌঁছন। ট্রেনে দীর্ঘ যাত্রা এবং নৌকায় নদী পেরিয়ে তিনি দ্বীপের বিভিন্ন গ্রামে যান।

সেখানে গিয়ে কোনও প্রস্তুত পরিকল্পনা চাপিয়ে না দিয়ে প্রথমে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন এবং সেই চাহিদার ভিত্তিতেই নিজের প্রকল্পের পরিকল্পনা তৈরি করেন।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্কুলে পাঠানোর আবেদন

একজন বিদেশি হিসেবে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্যান্ড্রা জানান, তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের অনুরোধ করতেন, যেন তাঁরা সন্তানদের স্কুলে পাঠান।

শুরুর দিকে অনেকেই দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা বাড়তে থাকে। একজন থেকে দশজন, তারপর আরও অনেক শিশু তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আজ পড়াশোনা করছে শতাধিক শিশু

বর্তমানে স্যান্ড্রার সংস্থা একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছে, যেখানে ১৫০ জন শিশু পড়াশোনা করে।

এছাড়া সরকারি স্কুলে পড়া আরও ১২০ জন শিশুকে নিয়মিত টিউশন ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়।

শুধু শিশুদের শিক্ষা নয়, ২০ জন মহিলাকে সেলাই প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে নিজের আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন।

এর পাশাপাশি সংস্থাটি শিশুবিবাহ, গার্হস্থ্য হিংসা, মানব পাচার এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে গ্রামে সচেতনতা তৈরির কাজও করছে।

সেবাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য

কর্পোরেট জীবন ছেড়ে আসার ১৫ বছর পরও স্যান্ড্রার মনে কোনও আক্ষেপ নেই।

তাঁর মতে, জীবনের সাফল্য শুধু অর্থ বা সম্পদে মাপা যায় না। বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া এবং নারীদের আত্মনির্ভর হতে সাহায্য করাই প্রকৃত সার্থকতা।

স্যান্ড্রার কথায়, অন্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন। যতদিন সম্ভব, এই কাজ চালিয়ে যেতে চান বলেও জানিয়েছেন তিনি।