কলকাতা: রাজ্য বার কাউন্সিলের নির্বাচন (Bar Council)ঘোষণার পর থেকেই বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। যেই নির্বাচনের ভিত্তি হওয়ার কথা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা, সেখানেই একের পর এক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে বিদ্ধ বিদায়ী বোর্ড।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সাংসদ সৌগত রায় এবং বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রথিতযশা আইনজীবীরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরের পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে আইনজীবী মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
PM Kisan Yojana 22nd Payment: কিস্তি পাওয়ার আগে জানুন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
আইনজীবী সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দীর্ঘদিনের সদস্য। একইভাবে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও নিয়মিত প্র্যাকটিস করা আইনজীবী। এত উচ্চপর্যায়ের ও পরিচিত নাম ভোটার তালিকায় না থাকা নিছক যান্ত্রিক ভুল হতে পারে না বলেই মত বহু আইনজীবীর। অভিযোগ উঠেছে, বিদায়ী বোর্ড পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা তৈরি করে নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দিতে চাইছে। এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে তৃণমূল কংগ্রেসের লিগ্যাল সেল বিদায়ী বোর্ডের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে।
শুধু হেভিওয়েট আইনজীবীদের নাম বাদ পড়াই নয়, ভোটার তালিকার সংখ্যাতত্ত্ব নিয়েও উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। ২০১৮ সালের শেষ বার কাউন্সিল নির্বাচনে প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবী ভোট দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পর প্রকাশিত নতুন খসড়া তালিকাতেও ভোটারের সংখ্যা সেই ৩০ হাজারেই আটকে।
আইনজীবীদের হিসেব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে হাজার হাজার নতুন আইনজীবী কাউন্সিলের সার্টিফিকেট নিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারের সংখ্যা অন্তত ৫০ থেকে ৫৫ হাজার হওয়ার কথা। অথচ অভিযোগ, নতুন আইনজীবীদের নাম তো নেই-ই, উল্টে পুরনো তালিকা থেকে প্রায় ১৭ থেকে ২০ হাজার বৈধ ভোটারের নাম কোনও কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য লিগ্যাল সেলের প্রাক্তন আহ্বায়ক তরুণ চট্টোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেন, “জেলায় জেলায় বহু সাধারণ আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম তালিকায় নেই। পরিকল্পিতভাবে এমন তালিকা করা হয়েছে যাতে নতুন ও নিরপেক্ষ আইনজীবীরা ভোট দিতে না পারেন। কিন্তু এই চক্রান্ত সফল হবে না।”
এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে ‘সার্টিফিকেট অফ প্র্যাক্টিস’ বা COP। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ, ২০১৬ সালে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন বহু আইনজীবী COP পাননি। আইন অনুযায়ী, COP না থাকলে ভোটার বা প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নেই। অথচ অভিযোগ উঠছে, বর্তমান নির্বাচনে এমন অনেক প্রার্থী আছেন যাঁদের বৈধ সার্টিফিকেট নেই। এমনকি চেয়ারম্যান অশোক দেবের নাম তালিকায় থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বার কাউন্সিলের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালানো আইনজীবী সুবীর সেনগুপ্ত জানান, সদস্যপদ ও ফি নেওয়া হলেও তার যথাযথ ব্যবহার বা স্বচ্ছতা নেই। জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও ফি নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন তিনি। এই সব বিষয় নিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছেন বলেও জানান।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার দাবিতে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। বিচারপতি কৃষ্ণা রাও মামলাটি গ্রহণ করে আগামী ৭ই জানুয়ারি শুনানির দিন স্থির করেছেন। শাসক ও বিরোধী সব পক্ষের আইনজীবীরাই একমত, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। অভিযোগ, অন্তত ২০ হাজার আইনজীবীর নাম অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আগেই নির্দেশ দিয়েছে, মার্চের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তদারকির জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আইনজীবীরা প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন এখন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং আইনি পেশার স্বচ্ছতা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৭ই জানুয়ারির শুনানিতে আদালতের নির্দেশই ঠিক করে দেবে সংশোধন হবে, না কি বিতর্কের মধ্যেই এগোবে রাজ্য বার কাউন্সিল নির্বাচন।




















