শ্রীনগর: নিয়ন্ত্রণ রেখার (LoC) ব্যবধান মাত্র ১০০ কিলোমিটারের। কিন্তু দুই পারের বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে যখন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) পাকিস্তানি প্রশাসনের শোষণ, চরম মুদ্রাস্ফীতি আর সেনার গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে; ঠিক তখনই ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে রচিত হল এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। হিমালয়ের ১১,৫০০ ফুট গভীরে কাশ্মীর ও লাদাখের ইঞ্জিনিয়াররা করমর্দন করে উদযাপন করলেন এশিয়ার দীর্ঘতম দ্বিমুখী ‘জোজিলা টানেল’ (Zojila Tunnel)-এর চূড়ান্ত ব্রেকথ্রু। একই দিনে ঘটা এই দুই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল, ভারতের কাশ্মীর আজ উন্নয়নের সরণিতে, আর পাকিস্তানের কবজায় থাকা কাশ্মীর জ্বলছে তীব্র ক্ষোভের আগুনে। (Zojila Tunnel Breakthrough)
একই দিনে দুই কাশ্মীরের দুই ভিন্ন ছবি
মঙ্গলবার, ৯ জুন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল ভারত। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়করীর উপস্থিতিতে ১৩.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জোজিলা টানেলের খননকাজ শেষ করে দুই প্রান্তের কর্মীরা মাটির নিচে মিলিত হলেন। ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ চালু হতে চলা এই টানেলটি লাদাখকে বছরের ১২ মাসই ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত রাখবে। শীতকালে ভারী তুষারপাতের কারণে লাদাখ যে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হতো, সেই দিন এবার অতীত হতে চলেছে।
ঠিক একই দিনে, নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে রাওয়ালকোটে নিষিদ্ধ ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC)-এর মিছিলে পাক সেনার গুলিবর্ষণে অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে (যদিও স্থানীয় সূত্রে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি)। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরো পিওকে জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে, শয়ে শয়ে মানুষকে বন্দি করেছে পাক সেনা।
পিওকে-তে কেন প্রতি বছর জ্বলছে আগুন?
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের ক্ষোভ আজ নতুন নয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পর ২০২৬ সালেও সেখানে আটা-ময়দার আকাশছোঁয়া দাম, বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল এবং পাঞ্জাব-নিয়ন্ত্রিত পাক প্রশাসনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাওয়ালকোটে, মুজফফরাবাদ ও মিরপুরের রাস্তায় এখন পাকিস্তানের থেকে ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতার স্লোগান উঠছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও বারবার স্পষ্ট করেছে যে, পিওকে-তে এই গণbিক্ষোভ পাকিস্তানের নির্মম শোষণ ও সম্পদ লুঠেরই স্বাভাবিক পরিণতি।
৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতের কাশ্মীরে রূপান্তর
অন্যদিকে, ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর আজ এক সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের আগে যেখানে বার্ষিক বিনিয়োগ ছিল ৪সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার নিচে, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা রেকর্ড ছুঁয়ে ৫,৮২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২০ সালে উপত্যকায় মাত্র ৬৯টি রেজিস্টার্ড স্টার্ট-আপ ছিল, আজ ২০২৬-এ এসে সেই সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে ২,০০০ স্টার্ট-আপ ছোঁয়া।
কাশ্মীরের বরফাবৃত উপত্যকা চিরে আজ ছুটে চলেছে ভারতের গর্ব ‘বন্দে ভারত এক্সপ্রেস’। চেনাব রেল ব্রিজ, জেড-মোড় টানেল এবং উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল লিঙ্কের মাধ্যমে কাশ্মীর আজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি জুড়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাথর ছুঁড়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার চেনা কাশ্মীর আজ ইতিহাস। শ্রীনগরের ক্যাফে-রেস্তোরাঁ আজ পর্যটকদের ভিড়ে ঠাসা, তরুণ প্রজন্ম আজ পাথর ছেড়ে ল্যাপটপ হাতে ব্যবসার স্বপ্ন দেখছে। ভারতের কাশ্মীরের এই চোখধাঁধানো উন্নয়নই এখন পাকিস্তানের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, আর সেই কারণেই মরিয়া হয়ে তারা সীমান্ত পেরিয়ে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।




















