
কেরলম: কেরলের নতুন সরকার গঠনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে এবার শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক (Vande Mataram)। জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ স্তবক গাওয়া নিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বাম শিবির। সিপিআই এবং সিপিএম নেতাদের দাবি, অনুষ্ঠানে পুরো ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনার পরিপন্থী। অন্যদিকে এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পাল্টা আক্রমণে নেমেছে বিজেপি। ফলে জাতীয় গান, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক আদর্শ এই তিনকে ঘিরে কেরালার রাজনীতি এখন তপ্ত।
১৮ মে কেরলের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কংগ্রেস নেতা ভি. ডি. সতীশন এবং তাঁর মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ‘বন্দে মাতরম’ গানের মাধ্যমে। তবে বিতর্কের সূত্রপাত হয় তখনই, যখন দেখা যায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দুটি স্তবকের পরিবর্তে পুরো গানটি পরিবেশন করা হয়েছে। এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে আপত্তি তোলে বাম নেতৃত্ব।
আরও দেখুনঃ পুরসভার নির্দেশে এবার বুলডোজার অভিযান অভিষেকের শান্তিনিকেতনে
সিপিআইয়ের কেরল রাজ্য সম্পাদক বিনয় বিশ্বম সরাসরি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে অতীতে জাতীয় গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবক গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ বাকি অংশে ধর্মীয় উপমা ও দেবী বন্দনার প্রসঙ্গ রয়েছে, যা সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জাতীয় সহমতের নীতি ভেঙে দিয়েছে।
শুধু সিপিআই নয়, সিপিএমের তরফ থেকেও একই সুর শোনা যায়। সিপিএম নেতা পি. এ. মোহাম্মদ রিয়াস সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারি অনুষ্ঠানে এমন পদক্ষেপ অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করে। তাঁর মতে, জাতীয় গান নিয়ে কোনও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
বাম নেতাদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের গণপরিষদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। স্বাধীনতার পর ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় গানের মর্যাদা দেওয়া হলেও, তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হবে। কারণ পরবর্তী স্তবকগুলিতে মাতৃভূমিকে দেবী দুর্গার রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন মহলে আপত্তি উঠেছিল। সেই কারণেই জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে সীমিত অংশ ব্যবহারের রীতি গড়ে ওঠে।
তবে বামেদের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিজেপি। বিজেপি নেতাদের প্রশ্ন, জাতীয় গান গাওয়া কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে যেতে পারে? তাঁদের দাবি, ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা আন্দোলনের আবেগ ও আত্মত্যাগের প্রতীক। দেশের জাতীয় গানকে নিয়ে আপত্তি তোলা মানে জাতীয় আবেগকে অসম্মান করা। বিজেপির একাধিক নেতা বামেদের বক্তব্যকে “ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি” বলেও কটাক্ষ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধুমাত্র একটি গানকে ঘিরে নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সংঘাতকেও সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে বামেদের বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এমন কিছু করা উচিত নয় যা কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, জাতীয় প্রতীক নিয়ে আপসের কোনও জায়গা নেই।
