
ঝাঁসির টকটোলি গ্রামে আজ এক অন্যরকম আবেগের আবহ (Ahmed Khan)। গ্রামের মাটির পথ, কাঁচা ঘর আর ধুলোমাখা আঙিনার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে এক বিরল দৃশ্য, যা ছুঁয়ে গেছে বহু মানুষের হৃদয়। ৫৫ বছর বয়সী আহমদ খান, একজন মুসলিম পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তি, মাথায় রামচরিতমানস তুলে খালি পায়ে রওনা দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত বাগেশ্বর ধামের উদ্দেশে।
শুধু যাত্রাই নয়, এই পদযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক বার্তা বহন করছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিশ্বাস আর মানবতার বার্তা। গেরুয়া বস্ত্র পরে, মুখে ‘রাম-রাম’ জপ করতে করতে, সঙ্গে ভজন-সংকীর্তন এইভাবেই গ্রাম ছাড়েন আহমদ খান। তাঁর সঙ্গে প্রথম দিনেই ৫০ থেকে ২০০ জন গ্রামবাসী পা মেলান। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলে ‘রাম-রাম’ ধ্বনি তুলে, ফুল ছড়িয়ে, মিষ্টি বিলিয়ে তাঁকে বিদায় জানান। টকটোলি যেন এক উৎসবের রূপ নেয়।
আরও দেখুনঃ যোগী দাওয়াইতে শ্রীঘরে হাওয়ালা চক্রের পান্ডা আবদুল-সুবহান
আহমদ খান জানিয়েছেন, প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি এক স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নে তিনি মাথায় রামচরিতমানস নিয়ে বাগেশ্বর ধামের পথে হাঁটছেন। বহু বছর ধরে সেই স্বপ্ন তাঁর মনে গেঁথে ছিল। অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার সেই স্বপ্ন পূরণ করবেন। রমজানের পবিত্র মাসেই যাত্রা শুরু করে তিনি যেন আরও বড় এক বার্তা দিলেন ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর এক।
বাগেশ্বর ধাম, যা মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলায় অবস্থিত, সেখানে অধিষ্ঠিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন আহমদ খান। তাঁর ভাষায়, “আমি সনাতন ধর্মকে গ্রহণ করতে চাই। ‘ঘর ওয়াপসি’র সংকল্প নিয়েছি।” তিনি সেখানে পৌঁছে রামচরিতমানস পাঠ করবেন এবং আশীর্বাদ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
তবে তাঁর স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত নয়। আহমদ খানের বড় লক্ষ্য নিজের গ্রামে একটি রাধা-কৃষ্ণ মন্দির নির্মাণ। প্রয়োজনে নিজের জমি বিক্রি করতেও প্রস্তুত তিনি। তাঁর কথায়, “মন্দির তৈরি হলে সেখানে নিয়মিত রামচরিতমানস পাঠ হবে, ভজন-সংকীর্তন হবে। গ্রামের মানুষ সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হবেন।” এই বক্তব্যে কেউ দেখছেন ভক্তির প্রকাশ, কেউ বা দেখছেন সামাজিক বার্তা।
গ্রামবাসীদের মতে, আহমদ খান বরাবরই শান্ত স্বভাবের মানুষ। তাঁর পরিবারও জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপে তাঁরা অবাক হলেও গর্বিত। তাঁদের বিশ্বাস, তিনি মানবতার পথেই চলেছেন। যাত্রাপথে বিভিন্ন গ্রামে তাঁকে ঘিরে ভিড় জমছে। কেউ জল দিচ্ছেন, কেউ ফল, কেউবা প্রণাম জানাচ্ছেন। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন এই দৃশ্য দেখে।
বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে বহুদিন ধরেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ইতিহাস রয়েছে। আহমদ খানের এই যাত্রা যেন সেই ঐতিহ্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর পদক্ষেপে কেউ দেখছেন আস্থার শক্তি, কেউ বা দেখছেন বিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা। কিন্তু টকটোলির মানুষ বলছেন একটাই কথা ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতা।
এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়েছে। কেউ বলছেন, এটি গঙ্গা-যমুনা তেহজিবের উজ্জ্বল উদাহরণ। কেউ আবার ‘ঘর ওয়াপসি’র প্রেরণা হিসেবে দেখছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন ঘটনা সমাজে আলোচনার জন্ম দিলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে কি না, তা সময়ই বলবে।

