সোহিনী পোড়েল, কলকাতা: যে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ২০২৩-এর ওয়ানডে বিশ্বকাপের (T20 World Cup) স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, সেই স্টেডিয়ামে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল। যে স্টেডিয়াম ‘অপয়া’ হিসেবে পরিচিত, সেই স্টেডিয়ামকেই কেন ফাইনালের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে? এমন হাজারও প্রশ্ন তুলেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ। কিন্তু সেই ‘অপয়া’ আমেদাবাদেই বিশ্বজয় করল টিম ইন্ডিয়া। ২০২৪-এ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন, ২০২৫-এ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়, ২০২৬-এ ফের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন মেন ইন ব্লু। এ যেন এক সোনালী ইতিহাস লিখলেন গুরু গম্ভীরের ছেলেরা।
ঘড়ির কাঁটায় ৭টা বাজতেই বাইশ গজে বল গড়াতে শুরু করে। আমেহাবাদে তাণ্ডব চালান সঞ্জু-অভিষেক-ঈশান-দুবেরা। ঠিক তেমনই বোলাররাও হতাশ করেননি। একের পর এক কিউই ব্যাটারকে সাজঘরে ফেরাতে থাকেন অক্ষর-বুমরা। বলাই বাহুল্য, ভারতের বোলিং লাইন আপের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল কিউইদের ব্যাটিং লাইন আপ। নিউজিল্যান্ড ব্যাটারদের কোমর ভেঙে দেওয়ার নাম মেন ইন ব্লু। এই কষ্টের জ্বালা হয়তো রাতে ঘুমোতে দেবে না কিউইদের। মেগা ফাইনাল যেন One-way traffic. ৯৬ রানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টিম ইন্ডিয়া।
টসে জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে কিউই বোলারদের ঠ্যাঙাতে শুরু করলেন দুই ভারতীয় ওপেনার অভিষেক শর্মা ও সঞ্জু স্যামসন। বিশ্বকাপের প্রায় প্রতি ম্যাচে যে ছেলেটা বার বার ব্যাট হাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, যাকে নিয়ে চলছিল চুলচেরা বিশ্লেষণ, মেগা ফাইনালে সেই বছর ২৫-এর যুবক ব্যাট চালাতে শুরু করলেন। টিম ম্যানেজমেন্ট যে তাঁর ওপর ভরসা করে কোনও ভুল করেনি, তা প্রমাণ করে দিলেন অভিষেক শর্মা। অর্ধশতরান করেন তিনি। কিন্তু ৭.১ ওভারে রাচিন রবীন্দ্রর বলে সাজঘরে ফিরলেন অভিষেক। স্কোরবোর্ডে ৫২(২১) রান যোগ করেন। বলটা ছেড়ে দিলে ওয়াইড হতো। তবে বাইরের বল খেলতে গিয়ে ব্যাটের কানায় লেগে টিম শেইফার্টের হাতে জমা পড়ে।
আরেক ওপেনার সঞ্জু স্যামসন তখন ঝাঁকিয়ে বসে আছেন ক্রিজে। তাঁকে সঙ্গ দিতে এলেন আরেক তরুণ তুর্কি ঈশান কিষাণ। তাঁরা দু জনে মিলে তাণ্ডব চালালেন। ১৫ ওভারে ২০০-র গণ্ডি পেরিয়ে যায় ভারত। এখানেই আসে কাহিনী মে টুইস্ট। এক ওভারে জেমস নিশাম গিলে খেলেন সঞ্জু স্যামসন (৮৯), ঈশান কিষাণ (৫৪) ও সূর্যকুমার যাদব (০)-কে। শতরানের সুযোগ হাতছাড়া হল সঞ্জু স্যামসনের। অধিনায়ক হয়ে রানের খাতা খুলতেই ব্যর্থ সূর্য। হার্দিক পান্ডিয়া এলেন। কিছুটা লড়াই করলেন। ম্যাট হেনরির বলে লং-অফের উপরে বড় শট মারতে গিয়ে ক্যাচ আউট হন হার্দিক। সহজ ক্যাচ অনায়াসে ধরেন কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। ১৩ বলে ১৮ রান তোলেন হার্দিক।
শেষে তিলক বর্মা ও শিবম দুবে বাকি কাজটা করে দেন। স্কোরবোর্ড যখন প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল তখন ম্যাচের হাল ধরেন দুবে। ৮ বলে ২৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে গেলেন তিনি। তিলক তুললেন ৮(৬) রান। নিউজিল্যান্ডের হয়ে ম্যাট হেনরি ও রাচিন রবীন্দ্র ১ টি, জেমস নিশাম ৩ টি করে উইকেট নেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৫৫ রান তোলে টিম ইন্ডিয়া। কিউইদের সামনে রানের পাহাড় খাঁড়া করে দেয় ভারত। জবাবে ব্যাট করতে নামেন টিম শেইফার্ট ও ইডেনে তাণ্ডবকারী ফিন অ্যালেন। ২.৪ ওভারেই বিধ্বংসী ফিন অ্যালেনকে সাজঘরে পাঠিয়ে কিউইদের বড়সড় ধাক্কা দিলেন অক্ষর প্যাটেল। টিম শেইফার্টকে সঙ্গ দিতে মাঠে এলেন রাচিন রবীন্দ্র। মাত্র ২ বল খেলতেই প্যাভিলিয়নের টিকিট তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন জশপ্রীত বুমরা। ৪.৫ ওভারে গ্লেন ফিলিপসকে (৫) সাজঘরে পাঠিয়ে ডিনার সারলেন অক্ষর প্যাটেল। মোদি স্টেডিয়াম জুড়ে শুধুই ভারতীয়দের চিৎকার।
হার্দিকের বলে ৮ বলে ৩ রান করে ফিরলেন মার্ক চ্যাপম্যানও। ততক্ষণে আরেক কিউই ওপেনার টিম শেইফার্ট একটু একটু করে স্কোরবোর্ড সচল রেখেছেন। অর্ধশতরানও করে ফেলেছেন। একটু হলেও ভয় পেতে শুরু করেছিলেন ভারতীয়রা। এমন সময় শর্ট বল করেন বরুণ চক্রবর্তী। পুল মারতে যান শেইফার্ট। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি বাউন্ডারির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঈশান কিষাণ। অনবদ্য দক্ষতায় বল ধরে ঈশান সাজঘরে ফেরত পাঠালেন শেইফার্টকে। ২৬ বলে ৫২ রান করেন তিনি। ১২.৫ ওভারে ষষ্ঠ উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। ড্যারিল মিশেল (১৭)-কে ডাগআউটে ফেরালেন অক্ষর প্যাটেল। তখন ক্রিজে রয়েছেন কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার।
জেমস নিশাম (৮), ম্যাট হেনরি (০)-কে বাইশ গজে টিকতেই দিলেন না বুম বুম বুমরা। কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারকেও গিলে খেলেন বুমরা। তাঁর অবদান ৩৫ বলে ৪৩ রান। ভারতের হয়ে অক্ষর প্যাটেল ৩ টি, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তী ও অভিষেক শর্মা ১ টি, জশপ্রীত বুমরা ১ টি করে উইকেট সংগ্রহ করেন। ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড।




















