জেনেভা: গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের (NCD) বাড়তে থাকা ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন নির্দেশিকা তৈরি করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। ২০২৬ সালের ৩০ জুন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে এই নির্দেশিকাগুলিকে বাস্তব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কীভাবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
WHO-এর মতে, অসংক্রামক রোগ বর্তমানে প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের জন্য অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠেছে। শুধু গর্ভাবস্থায় নয়, সন্তান জন্মদানের পরও এই রোগগুলির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মা ও সন্তানের স্বাস্থ্যের উপর পড়ে।
গর্ভাবস্থায় কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা গর্ভবতী নারীদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগগুলি আগে থেকেই থাকে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময়ই প্রথম ধরা পড়ে।
WHO জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে মাতৃমৃত্যুর প্রায় ২৩ শতাংশ এখন পরোক্ষ কারণে ঘটে, যার বড় অংশই অসংক্রামক রোগের সঙ্গে যুক্ত। রক্তক্ষরণের পর এটিই বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ সেখানেই অধিকাংশ মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
মা ও শিশুর উপর কী প্রভাব পড়ে?
স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি
গর্ভাবস্থায় NCD-তে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, বিপজ্জনক উচ্চ রক্তচাপ এবং জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শিশুর অকাল জন্ম, স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত কম বা বেশি ওজন নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) রাখতে হয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত নারীদের পরবর্তী জীবনে হৃদরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও ভবিষ্যতে স্থূলতা ও বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রবণতা বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ
WHO-এর প্রথম নির্দেশিকা ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে গর্ভাবস্থায় সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিয়ে সুপারিশ করা হয়। তবে বাস্তবে সেই নির্দেশিকা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে পর্যাপ্ত এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বা মাতৃ-ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। অনেক নারীর ক্ষেত্রে গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Antenatal Care) ছাড়া চিকিৎসকের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ হয় না। ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ অনেক সময় ধরা পড়ে না।
৩০ জুন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
এই সমস্যার সমাধানে ৩০ জুন WHO একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের আয়োজন করেছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করবেন কীভাবে নতুন নির্দেশিকাগুলিকে সীমিত সম্পদসম্পন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা যায়।
WHO-এর লক্ষ্য, গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যেই অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাকে অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে লক্ষ লক্ষ নারী ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষায় আগামী দিনে শুধু প্রসবকালীন পরিষেবা নয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। WHO-এর নতুন উদ্যোগ সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



