পাক সীমান্তের কাছে রাজস্থানে মিলল ৪,৫০০ বছরের হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন

জয়পুর: ভারতের মরুভূমি অধ্যুষিত রাজস্থানে আবিষ্কৃত হল হরপ্পা সভ্যতার এক প্রাচীন নিদর্শন। ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের দিক থেকে এটি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে মনে করছেন গবেষকরা। রাজস্থানের জয়সলমীর জেলার ...

By Moumita Biswas

Published:

Follow Us
Harappan civilisation discovered

জয়পুর: ভারতের মরুভূমি অধ্যুষিত রাজস্থানে আবিষ্কৃত হল হরপ্পা সভ্যতার এক প্রাচীন নিদর্শন। ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের দিক থেকে এটি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে মনে করছেন গবেষকরা। রাজস্থানের জয়সলমীর জেলার রতাডিয়া রি ডেরি নামক অঞ্চলে, যা পাকিস্তান সীমান্ত থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে, সেখানে মিলেছে হরপ্পা (সিন্ধু উপত্যকা) সভ্যতার  প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (Harappan civilisation discovered)।

এই প্রথমবার, থর মরুভূমির অন্তর্গত কোনও অঞ্চলে হরপ্পা সভ্যতার স্থায়ী বসতির চিহ্ন মিলল। যা এই প্রাচীন সভ্যতার ভৌগলিক বিস্তৃতি ও অভিযোজন ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

   

 কী মিলেছে খননে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, রতাডিয়া রি ডেরি-র এই পুরাতাত্ত্বিক স্থানটি একটি সংগঠিত, নগরায়িত হরপ্পান বসতি ছিল। এখানে যে সমস্ত নিদর্শন পাওয়া গেছে, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

  • লাল ও গম রঙের মাটির পাত্র, যার মধ্যে রয়েছে বাটি, কলস, মগ ও ছিদ্রযুক্ত জার
  • হাতে গড়া মাটির পাত্রে জ্যামিতিক অলঙ্করণ
  • রোহরি (বর্তমান পাকিস্তান) অঞ্চল থেকে আনা বলে অনুমান করা চের্ট পাথরের তৈরি ৮–১০ সেমি লম্বা ব্লেড
  • মাটি ও শাঁখের তৈরি চুড়ি
  • ত্রিভুজ, গোল ও ‘ইডলি’ আকৃতির টেরাকোটা কেক
  • পেষার কাজে ব্যবহৃত প্রাচীন পাথরের যন্ত্র
  • আংশিক গোলাকৃতি কাঠামোর ইঙ্গিতবাহী ওয়েজ-আকৃতির ইট
  • হরপ্পান শহর পরিকল্পনার প্রতীক-নিয়মিত আকারের আয়তাকার ইট
  • কেন্দ্রীয় স্তম্ভযুক্ত একটি চুল্লি কাঠামো, যা গুজরাটের কানমের এবং পাকিস্তানের মোহেঞ্জোদাড়োর চুল্লির সঙ্গে তুলনীয়
  • প্রাচীন প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ, যা সংগঠিত নির্মাণশৈলীর প্রমাণ দেয়

কে করল আবিষ্কার?

এই অভাবনীয় আবিষ্কারে নেতৃত্ব দেন রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ভারতীয় সংস্কৃতি বিভাগের গবেষক দিলীপ কুমার সাইনি, জয়সলমীরের ইতিহাসবিদ পার্থ জগানি, উদয়পুরের রাজস্থান বিদ্যাপীঠের অধ্যাপক জীবন সিং খড়কওয়াল, রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ তমেঘ পানওয়ার ও ডঃ রবীন্দ্র দেউড়া। তাঁদের সহায়তায় ছিলেন স্থানীয় শিক্ষক প্রদীপ কুমার গর্গ ও সমাজকর্মী চতর সিং ‘জাম’।

স্থানীয় স্তরে প্রদীপ গর্গ প্রথম এই স্থানের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন, যা পরবর্তীতে ‘Save Our Heritage Foundation’-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জুন মাসে ডঃ পঙ্কজ চন্দক (হিমাচল প্রদেশের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক) ও ডঃ কৃষ্ণপাল সিং (অরাবলী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ) স্থানটি পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন।

কী বলছেন গবেষকেরা?

গবেষক দিলীপ সাইনি জানান, “থর মরুভূমির বুকে হরপ্পা সভ্যতার এমন একটি শহরের অস্তিত্ব আমাদের বিস্মিত করেছে। এত প্রতিকূল পরিবেশেও বসতি গড়ে তোলা, সেই সভ্যতার অভিযোজন ক্ষমতার পরিচয় দেয়।”

ইতিহাসবিদ পার্থ জগানি বলেন, “এটি উত্তর রাজস্থান ও গুজরাটের মধ্যবর্তী মরু অঞ্চলে প্রথম হরপ্পা শহর। এর ভৌগলিক অবস্থান পাকিস্তান সীমান্তের এত কাছে হওয়ায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।”

ডঃ পঙ্কজ চন্দক ও ডঃ কৃষ্ণপাল সিং জানান, প্রায় ৫০ বাই ৫০ মিটার বিস্তৃত এই শহরটি সম্ভবত লুপ্ত সরস্বতী নদীর ধারে অবস্থিত ছিল।

ইতিহাসের পাতায় নতুন সংযোজন

গবেষকরা এই আবিষ্কারের প্রাথমিক বিশ্লেষণ ইতিমধ্যেই Indian Journal of Science-এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই শহরটির খনন আরও গভীরে চালানো হলে হরপ্পা সভ্যতার প্রসার ও অভিযোজন কৌশল সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে।

এই প্রাচীন নিদর্শন ভারতের মরুপ্রবণ অঞ্চলেও প্রাচীন নগর সভ্যতার বিকাশ ও টেকসই উপস্থিতির প্রমাণ রাখল। একইসঙ্গে, এটি হরপ্পা অধ্যয়নে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে৷ 

ভিডিও নিউজ দেখুন

Moumita Biswas

দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। হাতেখড়ি হয়েছিল ‘একদিন’ সংবাদপত্র থেকে। দেশ ও রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি নানা বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা করেন।

Follow on Google