শ্রষ্টার জন্মমাসেই বাংলায় খান খান ‘হীরক রানী’

ফলাফলের আবহে ‘হীরক রাজার দেশে’ প্রসঙ্গ তুলে শাসককে কটাক্ষ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভাতা ইস্যুতে তীব্র সমালোচনায় সরগরম রাজনীতি।

By Sudipta Biswas

Published:

Follow Us
bengal-election-political-criticism-hirak-rani-reference-analysis

সুদীপ্ত বিশ্বাস: বাংলায় আজ সকাল থেকেই গেরুয়া সুনামি। পোস্টাল ব্যালটে যে মহাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, হয়ত তা শেষ হবে রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হারের মধ্যে দিয়ে। কিছুক্ষন আগের পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে ১৮ তম রাউন্ডের গণনা শেষে ৪০০০ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই অবস্থা থেকে আর ফিরতে পারবেন না মমতা, এটাই বাস্তব। আজ এই আবহে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে অস্কার জয়ী, বাঙালির গর্ব সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে ছবিটা।

কাকতালীয় ভাবে এই মাস তার জন্ম মাস। গত ২ মে সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে তাঁর জন্মদিন। আজ মমতা সরকারের এই মহাপতনের কালে দাঁড়িয়ে হীরক রাজার দেশের এক একটা দৃশ্য যেন কঠিন বাস্তব। ছবিতে রাজা নিজেই সমাজের তিন শ্রেণীর জন্য আলাদা আলাদা বচন লিখে দিয়েছিলেন। আর বিরুদ্ধাচরণ করলেই জুটত মগজ ধোলাই। বাংলার পরিস্থিতিও হয়ে রয়েছে অনেকটা সেরকমই। রাজ্যের ‘হীরক রানী’ (যদিও এই নামটি বিজেপির দেওয়া) কোটি টাকা খরচ করে ভাতা নামক মগজ ধোলাইয়ের কল বানালেন।

   

আরও পড়ুন: ভবানীপুরে হারের মুখে শারীরিক হেনস্থার অভিযোগে ভিকটিম কার্ড মমতার

কৃষকের পেটে ভাত দিলেন না। আলু চাষীরা লক্ষ টাকার লোকসান করে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল, মেধাবীরা অন্য রাজ্যে চলে গেল। রাজ্য থেকে পেটের দায়ে পরিযায়ী হল ৫০ লক্ষ মানুষ। কারণ রাজ্যে যে শিল্প নেই, কর্মসংস্থান নেই তার বদলে আছে সিন্ডিকেট রাজ। সঙ্গে আছে ভাতা লক্ষীর ভান্ডার, যুব সাথী। ছবিতে শিক্ষামন্ত্রীর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। যুক্তি কি ছিল, ‘না এরা যত বেশি জানে তত কম মানে।’ তাই বন্ধ করে দাও শিক্ষাঙ্গন।

হ্যা বাংলাতেও বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৮২০০ সরকারি স্কুল। শিক্ষার মেরুদন্ড গিয়েছে ভেঙে। কোথাও শিক্ষক আছে তো ছাত্র নেই আবার কোথাও ছাত্র ছাত্রী আছে তো যোগ্য শিক্ষক নেই। শিক্ষকরা তো যোগ্যই হবেন তবুও শিক্ষক শব্দটা শুনলেই বাংলার মানুষ আজ আঁতকে ওঠেন। তার দায় ভারও রাজ্যের বিদায়ী সরকারের। এক সময়কার শিক্ষামন্ত্রীর বদান্যতায় মিশে গিয়েছিল যোগ্য এবং অযোগ্য। সীমাহীন ঘুষ নিয়ে অযোগ্যদের বানান হয়েছিল শিক্ষক। মামলা হল। ২৬০০০ শিক্ষক হল চাকরিহারা। চাকরি হারিয়ে কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গেল আবার কাউকে করতে হল আত্মহত্যা।

আরও পড়ুন: বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে কে?

তবুও বাংলার বিদায়ী সরকারের ঘুম ভাঙল না। আলাদা হল না চাল আর কাঁকড়। কেন হবে? রাজ্য সরকার যে বিশ্বাস করে ‘লেখাপড়া করে যেই, অনাহারে মরে সেই।’ বা ‘জানার কোনও শেষ নাই জানার ইচ্ছা বৃথা তাই।’ তাই রাজ্যে শিক্ষারও কোনও প্রয়োজন নেই, অর্থাৎ স্কুল বন্ধ। তবে শুধু কৃষক বা শিক্ষক নয় খোদ সরকারি কর্মচারীদের ক্ষোভও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে এই সরকারের পতনের পিছনে।

এবার একটু ছবির দৃশ্যে ফিরে যাই। দৃশ্যে বলরাম নামে এক খনির মজুরের আগমন। অভিযোগ যে পরিমান খাটনি সেই পরিমান মজুরি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবাদ করলেই জুটছে চাবুক। রাজা সব শুনে সহজেই সমাধান করে দিলেন। সভাকবি লিখে ফেললেন রাজ বচন। ‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ।’ অর্থাৎ খেটে যায় ফলের চিন্তা করো না। ছবিটা ভীষণ চেনা ঠেকছে তো ? হ্যা আমাদের বাংলাতেও সরকারি কর্মচারীরা মহার্ঘভাতা চাইলেই সরকারের মনে হত ‘কুকুরের ঘেউ ঘেউ।’

আদালতে মামলা চলল দীর্ঘদিন। মামলা চলাকালীন অবসর প্রাপ্ত কিছু কর্মচারীর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটল, কিন্তু সরকার অনড়। সরকার বলল মহার্ঘ ভাতা আবার মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে নাকি। কিন্তু কি আশ্চর্য যে ভাতা পেতে গিয়ে জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে গেল সরকারি কর্মীদের। ভোট ঘোষণা হতেই ভোটের লোভে ২৫% ভাতা জমা পড়ে গেল সরকারি কর্মীদের ব্যাংকে। তাতেও কিন্তু চিড়ে ভিজল না এবার। সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ এবার নিজেরাই উদয়ন পন্ডিতের ভূমিকায় অবতীর্ন হল। ১৫ বছরের যন্ত্রনা বুকে নিয়ে তারাও ভোট দিতে গেল মনে মনে একটাই মন্ত্র নিয়ে, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’ ‘অনাচার কর যদি, রাজা তবে ছাড়ো গদি।’

Sudipta Biswas

Sudipta Biswas is a senior correspondent at Kolkata24x7, covering national affairs, politics and breaking news.

Follow on Google