‘মসজিদে দোষ নেই, রাম মূর্তিতে কেন বাধা?’ কট্টরপন্থীদের তোপ তসলিমার, ফুঁসছে ঢাকা

ঢাকা: একদিকে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান শীতলতা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ। দুই মিলিয়ে এই মুহূর্তে খবরের শিরোনামে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ।…

World's Largest Lord Ram Statue Construction Halted in Bangladesh

ঢাকা: একদিকে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান শীতলতা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ। দুই মিলিয়ে এই মুহূর্তে খবরের শিরোনামে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বিগত কয়েক দিনের ঘটনাক্রম বলছে, ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে ক্রমশ বেজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা। আর এই টানাপড়েনের মাঝেই গাইবান্ধা জেলায় বিশ্বের বৃহত্তম রাম মূর্তি নির্মাণের কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় দানা বেঁধেছে নয়া বিতর্ক।

মৌলবাদীদের চাপে থমকালো রাম মূর্তির কাজ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকায় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে এক বিশাল তীর্থক্ষেত্র গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল। মূল আকর্ষণ ছিল ৮১ ফুট উচ্চতার এক সুবিশাল শ্রীরামের মূর্তি, যা বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম হওয়ার কথা ছিল। এর পাশাপাশি ৫০ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণ এবং ৩০ ফুট উচ্চতার শিব মূর্তি গড়ার কাজও এগোচ্ছিল। কিন্তু অভিযোগ, এই দেবমূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধে পথে নামে সেদেশের কট্টরপন্থীরা। তাদের লাগাতার প্রতিবাদের জেরেই বাধ্য হয়ে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করে দিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।

   

মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত জানিয়েছেন, এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতি যাতে কোনওভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেই কারণেই আপাতত কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিতর্ক এড়িয়ে সম্প্রীতির বার্তা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার, এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাসী। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগুক, এমনটা আমরা চাই না।” তবে এই মন্তব্যের পর নাগরিক সমাজের একাংশের তরফে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, রাষ্ট্র যদি সত্যিই সকলের হয়, তবে হিন্দুরা কেন নিজেদের উপাস্য দেবতার মূর্তি স্বাধীনভাবে গড়তে পারবেন না?

ভারতের পাতে ব্রাত্য ‘উপহারের আম’

মূর্তি বিতর্কের পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ‘সিজনস বেস্ট কমপ্লিমেন্টস’ বা মরশুমের উপহার হিসেবে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ১৭৫০ কেজি আম পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অথচ সেই আম এখনও দিল্লিতে পৌঁছয়নি। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস, উভয়েই নিয়ম করে প্রতি বছর ভারতের রাষ্ট্রনেতাদের জন্য আম পাঠাতেন। কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্যবাহী ‘আম কূটনীতি’ থেকে ভারতকে ঢাকা কার্যত বাদই রেখেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

চিন সফর ও রাষ্ট্রদূত তলবে উত্তাপ

কূটনৈতিক মহলের মতে, এই শীতলতার মাঝেই দিল্লির উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চিন সফর। নয়াদিল্লিকে এড়িয়ে সরাসরি বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার এই চেষ্টার মাঝেই, সম্প্রতি দিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে আটকের ঘটনায় পারদ আরও চড়েছে। ওই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিমধ্যেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনার পবনকুমার বঢেকে তলব করেছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক। সব মিলিয়ে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ যে বর্তমানে যথেষ্ট জটিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তসলিমার প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের গাইবান্ধায় কট্টরপন্থীদের চাপে রাম মূর্তি নির্মাণের কাজ বন্ধ হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। হিন্দু মন্দিরে বাধা দেওয়ার তীব্র নিন্দা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দেশে অবাধে নতুন মসজিদ তৈরি হলে রাম মূর্তি বা মন্দিরে এত আপত্তি কেন? তসলিমার মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু, উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান হওয়া উচিত। এই ঘটনা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।

অন্যদিকে, রাম মূর্তির অবমাননা এবং নির্মাণকাজ বন্ধের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে নামেন সনাতন ধর্মাবলম্বী পড়ুয়ারা। দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জগন্নাথ হল-সহ অন্যান্য ছাত্রাবাসের আবাসিকরা এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছয় এবং সেখানে দীর্ঘক্ষণ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা।