কলকাতা: বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। পূর্বের যে কোনো শিল্প বিপ্লবের তুলনায় ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ঘটছে অনেক দ্রুত গতিতে। বিশ্বখ্যাত শিল্পদ্যোগী ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা, সবার কণ্ঠেই এখন আশঙ্কার সুর। তাঁদের মতে, এই ‘এআই সুনামি’ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নিতে পারে, যার কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের কর্মীবাহিনী।
ইলন মাস্কের দর্শন: কর্মহীন প্রাচুর্যের ভবিষ্যৎ
টেসলা ও স্পেস-এক্স প্রধান ইলন মাস্কের মতে, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স মানুষের যাবতীয় কায়িক ও বৌদ্ধিক শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠবে। মাস্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫-২০৪৫ সালের মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য উপার্জনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে পণ্য ও পরিষেবার খরচ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে, যা জন্ম দেবে এক ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ মডেলের। মাস্কের ভাষায়, “তখন কাজ হবে মানুষের শখ, প্রয়োজন নয়।” তবে এই উত্তরণকালীন সময়টি প্রবল অস্থিরতার হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
আইএমএফ-এর ‘সুনামি’ সতর্কতা AI can replace 40 percent jobs
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মনে করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমবাজারে এমন এক প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়ছে, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় সমাজ পাচ্ছে না। ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, উন্নত অর্থনীতির ৬০ শতাংশ এবং ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ৪০ শতাংশ চাকরি এআই-এর প্রভাবে সরাসরি বদলে যাবে। সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘এন্ট্রি-লেভেল’ বা প্রাথমিক স্তরের কাজগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের কেরিয়ার গড়ার পথে বড় বাধা।
ভারতীয় প্রেক্ষাপট: ঝুঁকির মুখে ৩.৮ কোটি সংগঠিত শ্রমিক
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে তরুণ কর্মিবাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার প্রাধান্য বেশি, সেখানে এই অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের সংগঠিত ক্ষেত্রে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ চাকরি আমূল বদলে যাবে।
ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি কী কী?
উৎপাদন শিল্প: প্রায় ৮০ লক্ষ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে। স্বয়ংক্রিয় রোবটিক্স ও প্রিডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স এখন মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে।
খুচরো ব্যবসা: ইনভেন্টরি ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে এআই-এর দাপটে প্রায় ৭৬ লক্ষ পদ প্রভাবিত হতে পারে।
বিপিও ও আইটি: বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের মতো টেক-হাবে এন্ট্রি লেভেল কোডিং এবং কাস্টমার সার্ভিসের চ্যাটবট ব্যবহারের ফলে নিয়োগের হার কমছে। ক্লার্ক বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের প্রায় ৮১ শতাংশ কাজ এখন এআই-নির্ভর।
সম্পাদকীয় অভিমত: প্রস্তুতির সময় এখনই
ইউজিসি বা এআই নিয়ে আইএমএফ-এর এই সতর্কতা আসলে ভবিষ্যতের ‘ওয়েক-আপ কল’। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে এই ধাক্কা সামলাতে হলে প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে ‘রিস্কিলিং’ বা নতুন দক্ষতা অর্জনে মনোনিবেশ করতে হবে। রাষ্ট্রপুঞ্জ ও নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-বান্ধব কর্মনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা। এআই মানুষের কাজ সরাসরি না কেড়ে নিলেও, কর্মসংস্থানের সংজ্ঞাকে যে বদলে দেবে, তা নিশ্চিত।




















