নয়াদিল্লি: বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের (Indian Workers) নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৮০০-রও বেশি ভারতীয় প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে উপসাগরীয় (Gulf) দেশগুলিতে, যেখানে গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিনজন ভারতীয় কর্মীর প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি কাতারে বিস্ফোরণের ঘটনায় ১২ জন ভারতীয়ের মৃত্যু এই বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আরও কঠোর নজরদারির দাবি উঠেছে।
সৌদি আরবে সর্বাধিক মৃত্যু
বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের মধ্যে সৌদি আরবে ১৮২ জন ভারতীয় কর্মীর মৃত্যু হয়েছে, যা এই তালিকায় সর্বোচ্চ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি সপ্তাহে একজনেরও বেশি ভারতীয় কর্মী সেখানে কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এরপরেই রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE), যেখানে একই সময়ে ১২৮ জন ভারতীয়ের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সময়ে প্রবাসী ভারতীয়দের আত্মহত্যার ঘটনাগুলির বড় অংশও গালফ দেশগুলিতেই ঘটেছে, যা সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার দিকটি তুলে ধরছে।
কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা?
তেলেঙ্গানা এনআরআই মাইগ্র্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন-এর মতে, এই মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
• নিরাপত্তা সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার না করা
• কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি মেনে না চলা
• শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত ত্রুটি
• পর্যাপ্ত দক্ষতা ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের অভাব
সংগঠনের দাবি, গালফের অনেক এলাকায় শ্রমিকদের ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রায় কাজ করতে হয়। কাজ শেষে তাঁরা প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আবাসনে ফিরে যান। এই হঠাৎ তাপমাত্রার বড় পরিবর্তন শরীরের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় অধিকাংশ ভারতীয়
গালফে কর্মরত অধিকাংশ ভারতীয় নির্মাণ, খুচরো ব্যবসা, গুদাম এবং অটোমোবাইল শিল্পে কাজ করেন। এই ক্ষেত্রগুলিতে কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
তেলেঙ্গানা এনআরআই সেলের সহ-সভাপতি মান্ডা ভীম রেড্ডি বলেন, অনেক সময় শ্রমিকরাই হেলমেট, সুরক্ষা জুতো বা গ্লাভসের মতো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না। অনেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন নন।
আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলির দাবি, অনেক শ্রমিককে অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি পরিবেশে থাকতে হয়। নিম্নমানের খাবার, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং বেতন না পাওয়ার সমস্যাও মানসিক চাপ বাড়ায়।
তেলেঙ্গানা সরকারের এনআরআই অ্যাডভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান বি. এম. বিনোদ কুমার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের তিন মাস পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয় না, অথচ তাঁদের প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। বেতন পেলেও নানা অজুহাতে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁর আরও অভিযোগ, অনেক নিয়োগকারী সংস্থা কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাকে হার্ট অ্যাটাকের মতো ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে দেখিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। অল্প কিছু সংস্থাই বিমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়।
কী বলছে কেন্দ্র?
বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং রাজ্যসভায় জানিয়েছেন, বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
তিনি জানান, নয়াদিল্লি, দুবাই, রিয়াধ এবং জেদ্দায় ‘প্রবাসী ভারতীয় সহায়তা কেন্দ্র’ (Pravasi Bharatiya Sahayata Kendra) চালু রয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় দূতাবাসগুলিতে বিশেষ শ্রম শাখা কাজ করছে। নিয়মিত ওপেন হাউস এবং কনস্যুলার ক্যাম্প আয়োজন করে প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা শোনার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
এছাড়া, গালফ দেশগুলিতে ECR (Emigration Check Required) পাসপোর্টধারী মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি সংস্থাগুলিকেই e-Migrate পোর্টালের মাধ্যমে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।





