বিট্টু দত্ত, কলকাতা ডেস্ক: ভারতীয় ফুটবলের (Indian Football) বর্তমান বাস্তবতা আর ইউরোপীয় ফুটবলের উন্নতির পার্থক্য যেন এক দশকের ব্যবধানে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ে যখন কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল, তখন সেই ম্যাচ ঘিরে ফিরে এল দশ বছর আগের একটি স্মৃতি। সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন বাংলার ফুটবলার অভিজিৎ সরকার, যিনি একসময় ভারতের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে আর্লিং হালান্ডের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন।
২০১৭ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভারতীয় যুব দল নরওয়ে সফরে গিয়েছিল। সফরে বিভিন্ন ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলের বিরুদ্ধে একাধিক প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার পর শেষ ম্যাচটি ছিল নরওয়ের অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের বিরুদ্ধে। সেই দলেই খেলছিলেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। তখনও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় তারকা হয়ে ওঠেননি। তবে তাঁর প্রতিভার ঝলক সেই সময়ই দেখা গিয়েছিল। অভিজিৎ সরকার সেই ম্যাচের স্মৃতি এখনও স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন। তাঁর কথায়, তখন হালান্ডকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না। তাই আলাদা করে নজর দেওয়ার সুযোগও হয়নি। কিন্তু মাঠে তাঁর শারীরিক গঠন, গতি এবং বলের জন্য সঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে বক্সের ভিতরে তাঁর গতিবিধি এবং আকাশপথে বল দখলের দক্ষতা সেই সময়ই চোখে পড়েছিল।
আরও পড়ুন: এক মহাকাব্যিক যুগের বিষণ্ণ পতন! রোনাল্ডোর মহাপ্রস্থানের রাতে কোয়ার্টারে স্পেন
ম্যাচটি ভারত ২-০ গোলে হেরেছিল। প্রথম গোলটি করেছিলেন হালান্ড নিজেই। দ্বিতীয় গোলটি আসে এরিক বোথেইমের পা থেকে। তবে অভিজিতের মতে, ম্যাচের ফলাফল দেখে যতটা একপেশে মনে হয়, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা ছিল না। ভারতীয় দলও একাধিক ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন ৫৪ মিনিটে ভারতের সঞ্জীব স্ট্যালিন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এরপর দশ জন নিয়ে খেলতে বাধ্য হয় ভারত এবং সেই সুযোগই কাজে লাগিয়ে নরওয়ে দুই গোল করে ম্যাচ জিতে নেয়। এক দশক পর ছবিটা পুরোপুরি বদলে গেছে। আর্লিং হালান্ড আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। মোলডে, রেড বুল সালসবার্গ এবং বরুসিয়া ডর্টমুন্ড হয়ে তিনি এখন ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল ক্লাব ম্যাঞ্চেস্টার সিটির প্রধান ভরসা। ক্লাবের হয়ে জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ঐতিহাসিক ট্রেবল। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আরও পড়ুন: ভেঙে গেল জুটি! ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে বিচ্ছেদ ইমামির
অন্যদিকে, সেই ভারতীয় দলের সদস্য অভিজিৎ সরকার এখন কোল ইন্ডিয়ার হয়ে কলকাতা লিগে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হালান্ডের বিশ্বসাফল্য দেখে তাঁর মনে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনই রয়েছে অপূর্ণতার কষ্টও। তিনি বলেন, নরওয়ে সফরে ভারতীয় দলের পারফরম্যান্স মোটেই খারাপ ছিল না। একটি ম্যাচে তারা সাত গোলও করেছিল। এমনকি নরওয়ের বিরুদ্ধেও ভালো লড়াই হয়েছিল। কিন্তু আজ নরওয়ের সেই ফুটবলাররা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর ভারতের ফুটবলারদের বড় অংশ এখনও ঘরোয়া লিগের গণ্ডিতেই আটকে রয়েছেন। অভিজিৎ সরকারের এই স্মৃতিচারণ শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘদিনের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাত্রা শুরু করা দুই দেশের ফুটবলারদের পথ আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা, আর অন্যজন এখনও নিজের দেশের ঘরোয়া লিগেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ব্যবধানই ভারতীয় ফুটবলের উন্নয়নের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জের কথা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: লোবেরা জামানার ইতি! সবুজ-মেরুনের হট সিটে বসলেন পানাজিওটিস দিলম্পেরিস





