কলকাতা: ভারতের গ্রামাঞ্চলে বহু মানুষের কাছে খাদ্যের (Food Security) অন্যতম ভরসা বাজার বা কৃষিজমি নয়, বরং গ্রামের পুকুর, বন, চর, চারণভূমি ও জলাভূমির মতো যৌথ সম্পদ বা ‘কমনস’। এই স্থানগুলি থেকে মাছ, শাকসবজি, বুনো ফল, মাশরুম, বাঁশের কুঁড়ি, ঔষধি গাছ এবং গবাদি পশুর খাদ্য সংগ্রহ করে বহু পরিবার বছরের বিভিন্ন সময়ে নিজেদের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এই ‘অদৃশ্য সুপারমার্কেট’ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু জীবিকা নয়, কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
পুষ্টিকর খাবার কেনা এখনও অনেকের নাগালের বাইরে
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র ২০২৫ সালের ‘The State of Food Security and Nutrition in the World’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ৫৮ কোটি ৬৫ লক্ষ (৫৮৬.৫ মিলিয়ন) মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে সক্ষম নন।
প্রতিবেদনটি আরও জানিয়েছে, ২০২০ সালের পর থেকে বিশ্বের বহু অঞ্চলে খাদ্যের দাম সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে ফল, শাকসবজি এবং উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের মতো পুষ্টিকর খাদ্য নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। মানুষের কাছে পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
Also Read | ইভির উপর জোর ২০৩০ র মধ্যে তেল কেনায় ১লক্ষ সাশ্রয় চায় মোদী সরকার
কমনস কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রামাঞ্চলের পুকুর, বন, নদী, পাহাড়, চারণভূমি ও জলাভূমির মতো যেসব সম্পদ একটি সম্প্রদায় যৌথভাবে ব্যবহার করে, সেগুলিকেই সাধারণভাবে কমনস বা Common Property Resources (CPR) বলা হয়।
এসব সম্পদের উপর কোনও একক ব্যক্তির মালিকানা থাকে না। বহু গ্রামীণ পরিবারের কাছে এগুলি বিনা খরচে খাদ্য, পশুখাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদের উৎস।
পুকুর থেকে মাছ, বন থেকে বুনো ফল ও শাক, জলাভূমি থেকে খাদ্যযোগ্য উদ্ভিদ এবং চারণভূমি থেকে গবাদি পশুর খাদ্য সংগ্রহ করে বহু পরিবার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
শুধু পেট ভরায় না, পুষ্টিও নিশ্চিত করে
ভারতে সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলি মূলত চাল ও গমের মতো শস্যের উপর নির্ভরশীল। এগুলি ক্যালোরির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, পর্যাপ্ত ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে না।
অন্যদিকে কমনস থেকে পাওয়া মাছ, সবুজ শাক, বুনো ফল, মাশরুম ও অন্যান্য খাদ্য মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগ করে।
২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবার বন, জলাশয় ও অন্যান্য যৌথ সম্পদ থেকে নিয়মিত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, তাদের খাদ্যতালিকায় মাছ, সবুজ শাক এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
Also Read | ৫০ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠাতে বাংলায় পাঠাল তামিলনাড়ু সরকার
কারা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?
ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে (NSS)-এর ১৯৯৮ সালের ৫৪তম রাউন্ড অনুযায়ী, ভারতের প্রায় অর্ধেক পরিবার কোনও না কোনওভাবে কমনস থেকে সম্পদ সংগ্রহ করত।
বিশেষ করে ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই সম্পদগুলিই জীবিকার অন্যতম ভরসা।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরুষেরা অনেক সময় কমনসের সম্পদ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করলেও, গ্রামীণ মহিলারা মূলত পরিবারের খাদ্য, ওষুধ এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই এসব সম্পদের উপর নির্ভর করেন।
কেন কমে যাচ্ছে এই যৌথ সম্পদ?
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বনভূমি ও অন্যান্য যৌথ সম্পদের ব্যবহার বদলাতে শুরু করে। পরবর্তীতে বাঁধ নির্মাণ, খনি প্রকল্প, বাণিজ্যিক বনায়ন, শিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে বহু কমনস ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় বা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
এর ফলে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের খাদ্য ও জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুনভাবে ভাবার পরামর্শ
২০২৬ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা SEHAT (Science Excellence for Health through Agricultural Transformation) মিশনের সূচনা করেন। এই উদ্যোগে বায়োফর্টিফায়েড ফসল, পুষ্টিকর খাদ্য, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা এবং পুষ্টিনির্ভর সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের পাশাপাশি গ্রামের কমনস সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহু মানুষের কাছে এই যৌথ সম্পদই পুষ্টিকর খাদ্যের সবচেয়ে সহজ এবং সাশ্রয়ী উৎস।
তাঁদের মতে, ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু ‘খামার থেকে থালা’ মডেলে দেখলে চলবে না। খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি সম্পূর্ণ ভূদৃশ্যভিত্তিক (Landscape-level) বিষয় হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে বাজার, কৃষি, সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বন, পুকুর, জলাভূমি এবং অন্যান্য যৌথ সম্পদের ভূমিকাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


