
গোলের বন্যা, একতরফা দাপট আর আবেগে ভরা লাল হলুদ সমর্থকদের মানবিক মুহূর্ত, সব মিলিয়ে কন্যাশ্রী কাপ ২০২৬-এ (Kanyashree Cup) ইস্টবেঙ্গল মাঠের এই ম্যাচ যেন রীতিমতো এক ফুটবল উৎসবে পরিণত হয়েছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠ দাপিয়ে খেলল ইস্টবেঙ্গল এফসি, আর তাদের সামনে কার্যত অসহায় দেখাল দীপ্তি সংঘ এফসি-কে। স্কোরবোর্ডে ২১-০—সংখ্যাটা যতটা বড়, তার থেকেও বড় ছিল ইস্টবেঙ্গলের আধিপত্যের গল্প।
খেলা শুরুর বাঁশি বাজতেই আক্রমণের ঝড় তোলে ইস্টবেঙ্গল। প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোলের খাতা খুলে দেন নাওরেম প্রিয়াঙ্কা দেবী। তাঁর পায়ের জাদুতে একের পর এক আক্রমণ তৈরি হতে থাকে। পুরো ম্যাচে তিনি চারটি গোল করে দলের ভিত মজবুত করেন। তবে ম্যাচের আসল নায়িকা নিঃসন্দেহে অষ্টম ওরাওঁ। দুরন্ত গতিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে তিনি একাই ছয়টি গোল করে মাঠ মাতিয়ে দেন। তাঁর প্রতিটি গোল যেন দর্শকদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলছিল। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার দায়িত্ব সামলান পূর্ণিমা দাস। তিনিও নিজের নাম লেখান স্কোরশিটে। একইভাবে শ্রাবনী মুর্মু ও সন্ধ্যা মাইতি নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন, যার মধ্যে সন্ধ্যা একাই চারবার জালে বল জড়ান। সিল্কি দেবীর চারটি গোল দলের আক্রমণভাগকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ম্যাচের শেষদিকে আন্টাসিয়া ওরাওঁ একটি গোল করে এই বড় জয়ের সিলমোহর দেন। ম্যাচ শেষে ছয় গোলের নায়িকা অষ্টম ওরাওঁ মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি। তিনি বলেন, “আজকের জয়ে আমি খুবই খুশি। তবে এটা শুধু আমার সাফল্য নয়, পুরো দলের পরিশ্রমের ফল। কোচ আমাদের যে পরিকল্পনা দিয়েছিলেন আমরা সেটাই মাঠে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি। সতীর্থরা বারবার আমাকে ভালো পাস দিয়েছে বলেই গোলগুলো করা সম্ভব হয়েছে। সামনে আরও কঠিন ম্যাচ আছে, তাই এখন থেকেই মনোযোগ ধরে রাখতে হবে।” এমন ‘তাণ্ডব’ পারফরম্য়ান্সের পর স্বাভাবিকভাবে অত্যন্ত খুশি লাল-হলুদ ব্রিগেডের কোচ অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুস। তাঁর কথায়, ‘দলের মেয়েরা যথেষ্ট ভাল পারফরম্য়ান্স করেছে। এই দলে প্রচুর স্থানীয় ফুটবলার রয়েছে। তারাও যথেষ্ট নজর কেড়েছে। আর এটা একজন কোচ হিসেবে আমাকে অনেকটাই স্বস্তি দিয়েছে। কারণ, এই ফুটবলারদের নিয়েই আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করি।’
অন্যদিকে দীপ্তি সংঘ এফসি লড়াই করার চেষ্টা করলেও, ইস্টবেঙ্গলের ধারাবাহিক আক্রমণের সামনে বারবার ভেঙে পড়ে তাদের রক্ষণ। গোলরক্ষক একাধিক সেভ করেও দলকে বড় ব্যবধানে হার থেকে বাঁচাতে পারেননি। তবে ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও সম্মান দেখা গেল, সেটাই ছিল দিনের সবচেয়ে বড় মানবিক দিক। প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়া, কাঁধে হাত রেখে সাহস জোগানো—এই দৃশ্যগুলোই প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি একে অপরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসারও খেলা।
ম্যাচ শেষে দীপ্তি সংঘের সহকারী কোচ সৌমেন দাস বলেন, “স্কোরলাইন হতাশাজনক, এটা মানতেই হবে। তবে মেয়েরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, সেটাই ইতিবাচক দিক। আমরা কোথায় ভুল করেছি, তা বিশ্লেষণ করব। এই অভিজ্ঞতা থেকেই শিখে আগামী ম্যাচে আরও শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।” এই জয়ের মাধ্যমে ইস্টবেঙ্গল এফসি শুধু তিন পয়েন্টই অর্জন করল না, বরং টুর্নামেন্টে নিজেদের শক্তিশালী দাবিও প্রতিষ্ঠা করল। অন্যদিকে দীপ্তি সংঘ এফসি-র জন্য এটি কঠিন শিক্ষা, তবে আগামী ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনও রয়েছে।













