পরিষ্কার ও প্রায় অসীম শক্তির উৎসের সন্ধানে বহু বছর ধরে গবেষণা চলছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। (China BEST)সেই দৌড়ে এবার বড়সড় অগ্রগতি দেখাতে চলেছে চিন। চিনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আনহুই প্রদেশের রাজধানী হোপেই প্রদেশে নির্মীয়মাণ BEST Fusion Reactor বা Burning Plasma Experimental Superconducting Tokamak প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পটিকে অনেকেই চিনের নতুন “আর্টিফিশিয়াল সান” বা কৃত্রিম সূর্য বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ, এর মূল প্রযুক্তি হল নিউক্লিয়ার ফিউসন যে প্রক্রিয়ায় সূর্যের ভেতরে শক্তি উৎপন্ন হয়। যদি এই প্রযুক্তি সফলভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে প্রায় অসীম পরিমাণ পরিষ্কার শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।
আরও দেখুনঃ শেষ মুহূর্তে কেরালার ধাক্কা, যুবভারতীতে জিতেও জিতল না ইস্টবেঙ্গল
চীনা গবেষকদের দাবি, BEST রিঅ্যাক্টরটি সফল হলে এটি মানব ইতিহাসে প্রথম ফিউশন ডিভাইস হতে পারে যেখান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে ফিউশন রিঅ্যাক্টরগুলি রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই মূলত গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, চীনের আরেকটি পরীক্ষামূলক রিঅ্যাক্টর ইস্ট টোমাক বহু বছর ধরে ফিউশন প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে, কিন্তু তা এখনও বিদ্যুৎ গ্রিডে শক্তি সরবরাহ করতে সক্ষম নয়।
BEST প্রকল্পের লক্ষ্য হল সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে ফেলা। বিজ্ঞানীদের মতে, এই রিঅ্যাক্টরে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে যা “বার্নিং প্লাজমা” অবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে পারে। ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ভেতরে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাজমা তৈরি হয়, যা সূর্যের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এই প্লাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই ফিউশন থেকে ধারাবাহিক শক্তি উৎপাদন সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিউশন শক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি পরিবেশবান্ধব। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না এবং প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও তৈরি হয় না। ফলে ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এটি বড় সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রযুক্তি সফল হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের জ্বালানি নির্ভরতা পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে না। ফিউশন শক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য করতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। গবেষকদের মতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি শিল্প-স্তরের প্রোটোটাইপ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। আর ২০৫০ সালের মধ্যে ফিউশন শক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য বড় দেশও ফিউশন শক্তি নিয়ে গবেষণায় এগিয়ে রয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করছে। তবে চীন তাদের দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে বড়সড় নেতৃত্ব নিতে চাইছে।
যদি BEST রিঅ্যাক্টর পরিকল্পনা অনুযায়ী সফল হয়, তাহলে তা শুধু চিনের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থার জন্যই একটি যুগান্তকারী ঘটনা হতে পারে। কারণ, ফিউশন শক্তি বাস্তবে কার্যকর হলে তা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ শক্তির চিত্রই বদলে দিতে পারে যেখানে পরিষ্কার, নিরাপদ এবং প্রায় অসীম শক্তি মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।



















