মমতার হুঁশিয়ারি উড়িয়ে বাংলায় কার্যকর হল ওয়াকফ সংশোধনী আইন

কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নয়া মোড়। মাসের পর মাস কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন ওয়াকফ সংশোধনী আইন, ২০২৫ কার্যকর করতে অস্বীকার করার পর অবশেষে সেই আইনই মানতে বাধ্য হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ...

By Sudipta Biswas

Published:

Follow Us
west-bengal-waqf-amendment-act-implementation-82000-properties-upload

কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নয়া মোড়। মাসের পর মাস কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন ওয়াকফ সংশোধনী আইন, ২০২৫ কার্যকর করতে অস্বীকার করার পর অবশেষে সেই আইনই মানতে বাধ্য হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।

বৃহস্পতিবার রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতরের সচিব পি বি সেলিম সব জেলা শাসকদের উদ্দেশে চিঠি জারি করে নির্দেশ দেন, রাজ্যের ৮২ হাজার ওয়াকফ সম্পত্তির তথ্য ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রের উমীদ পোর্টালে আপলোড করতে হবে। উচ্চপদস্থ সূত্রের দাবি, এর মাধ্যমে রাজ্য কার্যত স্বীকার করে নিল যে আইনটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

   

মুসলিম তোষণকারী তৃণমূলের ‘বন্দে মাতরম’ প্রীতিতে বিস্ফোরক বিজেপি

উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদের দুই কক্ষেই পাশ হয় ওয়াকফ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৫। সংশোধিত আইনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক উঠে আসে—ওয়াকফ বোর্ড ও ট্রাইব্যুনালে অ-মুসলিম সদস্য থাকবে এবং কোনো সম্পত্তিকে ওয়াকফ দাবি করা হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এ বিষয়টাকেই শুরু থেকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে তুলে ধরেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, “আমি বাংলায় এই আইন কার্যকর হতে দেব না। এখানে ৩৩ শতাংশ মুসলিম মানুষ আছে, তাঁদের রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।”

আইন পাশের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভও হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তৃণমূল সরকার আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু আদালতের রায় রাজ্য সরকারের পক্ষে না যেতেই প্রশাসনের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ রইল না। আইনটির 3B ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, দেশের সব রাজ্যকে তাদের নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তির তথ্য ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করতে হবে—যার শেষ তারিখ ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫।

এই প্রেক্ষাপটেই বৃহস্পতিবারের নির্দেশিকা জারি হয়। সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতরের চিঠিতে জানানো হয়েছে, রাজ্যে ৮,০০০-রও বেশি ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে এবং এর বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট মুতাওয়াল্লিদের মাধ্যমে আপলোড করতে হবে। সেজন্য একটি আট দফা কর্মপরিকল্পনা স্কুলের ক্লাসরুমের মতো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথমত, প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে কেন্দ্রীয় উমীদ পোর্টালটি ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। এরপর মুতাওয়াল্লি, ইমাম, মাদ্রাসাশিক্ষকদের নিয়ে কর্মশালা করতে হবে যাতে আপলোড প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তথ্য দেওয়ার কাজ দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে—ওটিপি-ভিত্তিক প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন ও ওয়াকফ সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ যুক্ত করা। উল্লেখযোগ্যভাবে বলা হয়েছে, বিতর্কিত ওয়াকফ সম্পত্তিগুলি আপাতত এই পর্বে আপলোড না করলেও চলবে।

এছাড়াও প্রতিটি জেলায় নির্দিষ্ট সরকারি কর্মী নিয়োগ, দৈনিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, রাজ্যস্তরের সিনিয়র অফিসারদের জেলায় পরিদর্শন, আট জেলায় হেল্পডেস্ক তৈরি এবং দৈনিক দু’ঘণ্টার ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার।

রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে একাধিক মঞ্চে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি এই আইন মানবেন না, সেই অবস্থান থেকে এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। বিজেপির দাবি, তৃণমূলের প্রাথমিক আপত্তি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, এবং অবশেষে কেন্দ্রীয় আইনের সামনে মাথা নত করতেই হল। অন্যদিকে তৃণমূলের অভিমত আইনটি রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থে ক্ষতিকর, তাই আইনগত পথেই লড়াই চালানো হয়েছিল; এখন আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে।

যাই হোক, বাস্তব পরিস্থিতি হলো ওয়াকফ বোর্ডের উপর রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সংঘাতের মধ্যে এবার কাগজে-কলমে রাজ্যকে কেন্দ্রীয় আইনের নির্দেশ মেনে চলতে হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা যাবে, ৮২ হাজার সম্পত্তির তথ্য আপলোডের বিশাল কর্মযজ্ঞ রাজ্য কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারে।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sudipta Biswas

Sudipta Biswas is a senior correspondent at Kolkata24x7, covering national affairs, politics and breaking news.

Follow on Google