করাচি: পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) সরকারবিরোধী আন্দোলন নাটকীয় ও বিস্ফোরক মোড় নিয়েছে। মঙ্গলবার রালাকোটের ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, “এই অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ নয়।” ইসলামাবাদ যদি অবিলম্বে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক না করে, তবে অঞ্চলের বাসিন্দারা বেঁচে থাকার জন্য ‘অন্য পথ’ বেছে নিতে বাধ্য হবেন, এমন হুঁশিয়ারিতেই কাঁপছে পাক প্রশাসন। (Pakistan Occupied Kashmir Protest)
অবরোধ বনাম জনরোষ
দীর্ঘদিন ধরে চলা খাদ্য সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ মঙ্গলবার বিস্ফোরণের রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পাকিস্তান সরকার পরিকল্পিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের ওপর ‘যৌথ শাস্তি’ বা ‘কালেক্টিভ পানিশমেন্ট’ চাপিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় নেতা সর্দার আমন খান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “আমাদের তোমাদের রেশনের প্রয়োজন নেই। বরং তোমরাই আমাদের ওপর নির্ভরশীল।” তাঁর এই হুঙ্কার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতি অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের অনাস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দমন-পীড়নের আড়ালে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
জাম্মু-কাশ্মীর আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির (JAAC) নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে পাকিস্তান সরকার গত মাসের শুরুতেই এই সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’-এর আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আন্দোলনকারী নেতা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী ধারায় মামলা দায়ের করে তাঁদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তান সরকার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দাবিতে চলা এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ‘নিরাপত্তার সংকট’ হিসেবে দেগে দিয়ে আদতে সামরিক দমন-পীড়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করছে।
বিরতিহীন সংঘর্ষ ও মৃত্যুমিছিল
ইতিমধ্যেই এই উত্তাল পরিস্থিতির বলি হয়েছেন অন্তত ২২ জন সাধারণ মানুষ। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চলা অচলাবস্থায় গোটা অঞ্চলে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আড়াল করতে জুন মাসের শুরু থেকেই অঞ্চলজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে প্রশাসন, যাতে আন্দোলনের বীভৎসতা বাইরের পৃথিবীর সামনে ফুটে না ওঠে।
বিদ্বেষের বীজ ও খাদের কিনারে সম্পর্ক
এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের সাম্প্রতিক এক অসংবেদনশীল ও উস্কানিমূলক মন্তব্য। তিনি রালাকোট ও মিরপুরের বাসিন্দাদের “আসল কাশ্মীরি নন” বলে যে কটাক্ষ করেছিলেন, তা অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলন কেবল খাদ্যের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ইসলামাবাদ ও অধিকৃত কাশ্মীরের স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে কয়েক দশকের ফাটলকে আরও চওড়া করে দিয়েছে। কাশ্মীরি জনমানসে পাকিস্তানের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান ঘৃণা এবং বিদ্রোহের আগুন এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।





