
ঢাকা: বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (national election)ঘিরে প্রার্থীর সংখ্যার পরিসংখ্যান সামনে আসতেই নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দানা বাঁধছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত মোট ২৫৬৯ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মহিলা প্রার্থী মাত্র ১০৮ জন ছিলেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭-এ। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.২৬ শতাংশই মহিলা।
এই পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এই কারণে যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। শুধু তাই নয়, এই দেশেই অতীতে দু’জন মহিলা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবুও জাতীয় সংসদের নির্বাচনে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ এতটাই সীমিত থাকা, অনেকের মতে, গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার ইঙ্গিত বহন করছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তে শান্তি রক্ষায় সেনা প্রধানের সতর্কতা, আলোচনা অব্যাহত
এ বারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল। তার মধ্যে ৩০টি দলের কোনও মহিলা প্রার্থীই নেই। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও মহিলা মনোনয়নের হার অত্যন্ত কম। বিএনপি ১৩টি আসনে এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ১০টি আসনে মহিলা প্রার্থী দিয়েছে। বাকি দলগুলির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলগুলির কোনও মহিলা প্রার্থী নেই।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বারে ৪০ জন মহিলা নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। অর্থাৎ মোট মহিলা প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কোনও দলের টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে নারীদের রাজনীতিতে আগ্রহের অভাব নেই, বরং দলীয় মনোনয়ন পাওয়াই তাঁদের সবচেয়ে বড় বাধা।
নির্দল মহিলা প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম প্রাক্তন বিএনপি সাংসদ রুমিন ফারহানা। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়াও প্রাক্তন এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসন থেকে লড়ছেন। তাঁদের উপস্থিতি কিছুটা হলেও আলোচনায় এসেছে, তবে সামগ্রিক ছবিটা বদলাতে তা যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের মতে, এই পরিস্থিতি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। বড় রাজনৈতিক দলগুলি যখন অল্পসংখ্যক মহিলাকে মনোনয়ন দেয়, তখন ছোট দলগুলিও সেই পথেই হাঁটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক মানসিকতা ও অর্থনৈতিক বাধা। নির্বাচনী রাজনীতিতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের পিছিয়ে দেয়।
অভিনেত্রী-রাজনীতিক রোকেয়া প্রাচীর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশও নারীদের জন্য অনুকূল নয়। তাঁর কথায়, “ইউনূস জমানায় মহিলারা ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছেন। তৌহিদি জনতার মব সংস্কৃতির শিকার হচ্ছেন মহিলারাও। রাষ্ট্রনীতিতে মহিলাদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্বাচনী লড়াইয়েও।”
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে সরব হয়েছে বাংলাদেশের একাধিক নারী সংগঠনের যৌথ মঞ্চ ‘নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’। ওই মঞ্চের অন্যতম সংগঠন ‘নারীপক্ষ’-এর নেত্রী গীতা দাস জানান, জুলাই সনদের খসড়া অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০-এই রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলিকে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা তাঁদের।










