মুর্শিদাবাদ: তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পর মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে বড়সড় চমক দিলেন ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সোমবার বেলডাঙায় জনসভা করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। দলের নাম রাখা হয়েছে জনতা উন্নয়ন পার্টি (JUP)। একইসঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর লড়াই হবে গোলাপ প্রতীক নিয়ে।
দলের নাম ঘোষণার মঞ্চ থেকেই হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট করে দেন তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য। তিনি বলেন, “আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন। ধর্ম বা দলীয় স্বার্থ নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান উদ্দেশ্য।” তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, মূলধারার রাজনীতির বাইরে গিয়ে তিনি আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়তে চান।
গোলাপ প্রতীক বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও নিছক প্রতীকী নয়, বরং কৌশলগত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক জোড়াফুল এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির প্রতীক পদ্মফুল উভয়ই ফুলচিহ্ন। সেই দুই শক্তিশালী দলের মাঝেই আরও একটি ফুল যুক্ত করে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চান হুমায়ুন কবীর। তাঁর মতে, গোলাপ ভালোবাসা, শান্তি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক, যা সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হতে পারে।
হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক জীবন বরাবরই নানা উত্থান-পতনে ভরা। তিনি এক সময় কংগ্রেসের সক্রিয় নেতা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন, আবার কংগ্রেসে ফিরে যান। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবেও তাঁকে ভোটে লড়তে দেখা গিয়েছিল। এরপর ফের তৃণমূলে যোগ দিয়ে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীকে জয়ী হয়ে ভরতপুরের বিধায়ক হন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সংঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দল তাঁকে সাসপেন্ড করে। সাসপেনশনের পরও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি হুমায়ুন কবীর। গত ৬ ডিসেম্বর তিনি মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। ঠিক ১৬ দিনের মাথায় তিনি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা করলেন।
নতুন দল ঘোষণার মঞ্চ থেকেই শাসক দলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান হুমায়ুন কবীর। বেলডাঙার মির্জাপুর সংলগ্ন মাঠে জনসভায় তিনি বলেন, “২০১১ সালে এই জেলায় তৃণমূলের একজন বিধায়ক ছিল। ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে চার হয়। ২০২১ সালে আমি সেই সংখ্যা ২০-তে পৌঁছে দিয়েছি। ২০২৬ সালে আমিই এই জেলায় তৃণমূলকে শূন্যতে নামিয়ে আনব।”
এই মন্তব্যের পরেই মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনৈতিক অন্দরমহলে ব্যাপক আলোড়ন শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, হুমায়ুন কবীরের নতুন দল সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেকের মতে, এটি মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের উপর চাপ তৈরির একটি কৌশল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে জনতা উন্নয়ন পার্টি কতটা সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে পারে এবং গোলাপ প্রতীক মানুষের মধ্যে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেটাই এখন রাজ্য রাজনীতির বড় প্রশ্ন।
