ইসলামাবাদ: পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে (Asim Munir) হত্যার জন্য ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গোপনে পরিকল্পনা করেছিল বলে এক চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তবে পাকিস্তানের শীর্ষ সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ‘অশুভ প্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ব্রাজিলের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবার একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার সময় আসিম মুনির এবং তাঁর প্রতিনিধিদলকে টার্গেট করার পরিকল্পনা ছিল মোসাদের।
জেনেভা বৈঠক ও ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’
এসকোবারের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি সম্ভাব্য চুক্তি, যাকে তিনি “ইসলামাবাদ মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU)” নামে উল্লেখ করেছেন, তা নিয়ে জেনেভায় আলোচনা চলছিল।
সেই বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়।
‘মোসাদের হত্যার পরিকল্পনা’ দাবি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারিও নওফালের পডকাস্টে এসকোবার বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নাকি নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল যে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি নির্দেশে মোসাদ আসিম মুনির ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে হত্যার পরিকল্পনা করছিল।
এসকোবারের মতে, মার্কিন-ইরান আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করছিল ইজরায়েল। সেই অসন্তোষ থেকেই এই পরিকল্পনার সূত্রপাত হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
পাকিস্তানের পাল্টা হুঁশিয়ারি?
এসকোবার আরও দাবি করেন, এই তথ্য জানার পর পাকিস্তান কূটনৈতিক মাধ্যমে ইজরায়েলের কাছে কঠোর বার্তা পাঠায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান নাকি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “আমাদের প্রতিনিধিদলের গায়ে হাত পড়লে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।” তবে এই বক্তব্যের কোনও স্বাধীন বা সরকারি প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
পাকিস্তানেই উড়ে গেল দাবি
এই দাবি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও পাকিস্তানের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের একাংশ তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ তালাত হুসেন সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এটি সম্পূর্ণ আজগুবি গল্প। এর মধ্যে কোনও সত্যতা নেই। এমন কিছু ঘটেনি।”
পাকিস্তানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, এটি “vile and vicious propaganda” অর্থাৎ “ঘৃণ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার”।
কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া নেই
এখনও পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পাকিস্তান সরকার বা ইজরায়েল সরকার এই অভিযোগ নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
ফলে গোটা ঘটনাটি আপাতত শুধুমাত্র একটি সাংবাদিকের দাবি এবং পাল্টা অস্বীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইজরায়েল-পাকিস্তান সম্পর্কের পুরনো টানাপোড়েন
যদিও এই নির্দিষ্ট অভিযোগের কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও ঘটনাটি ইজরায়েল ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ককে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তান এখনও ইজরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে গাজা ও লেবানন ইস্যুতে পাকিস্তানের একাধিক শীর্ষ নেতা ইজরায়েলের কড়া সমালোচনা করেছেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আগের মতোই বজায় রয়েছে।
তবে আসিম মুনিরকে হত্যার কথিত ষড়যন্ত্রের দাবি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সরকারি নিশ্চিতকরণ না থাকায় বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।



