Damayanti Sen: প্রায় ৪৮ ঘণ্টার উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং লাগাতার খোঁজাখুঁজির অবসান ঘটল শনিবার ভোরে। নিখোঁজ জাতীয় স্তরের রাইফেল শুটার দময়ন্তী সেন অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। ভোরবেলায় একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়ে দময়ন্তীর বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেন জানতে পারেন, রামকৃষ্ণপুর ঘাট এলাকায় তাঁর মেয়েকে দেখা গিয়েছে। খবর পেয়েই আর সময় নষ্ট না করে তিনি বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
প্রথমে হাওড়া স্টেশন হয়ে তিনি পৌঁছন রামকৃষ্ণপুর ঘাটে। সেখানে লঞ্চঘাটের জেটির এক কোণে চুপচাপ বসে থাকতে দেখেন দময়ন্তীকে। দীর্ঘ দু’দিন পর বাবাকে সামনে দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি কিশোরী। বাবাকে দেখেই তার প্রথম কথা ছিল, “বাবা, বাড়ি চলো।” সেই মুহূর্তে বাবা-মেয়ের আবেগঘন পুনর্মিলন উপস্থিত সকলকেই স্পর্শ করে।
মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন দময়ন্তীর মা-ও। তিনি পুলিশ, প্রশাসন এবং যাঁরা বিভিন্নভাবে খোঁজ চালাতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ধ্রুবজ্যোতি সেন জানান, এক ব্যক্তি ফোন করে তাঁকে জানান যে, অন্য পোশাক পরে রামকৃষ্ণপুর ঘাটের কাছে ঘোরাফেরা করছে দময়ন্তী। সেই খবর পেয়েই তিনি সেখানে যান এবং মেয়েকে খুঁজে পান।
মেয়ের হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা দিয়েছেন ধ্রুবজ্যোতি। তাঁর কথায়, পড়াশোনা এবং রাইফেল শুটিং— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে দময়ন্তী মানসিক চাপে ভুগছিল। বাড়ি ফিরে সে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আবার পুরোপুরি খেলাধুলায় মন দিতে চায়। পরিবারও এখন তাকে মানসিকভাবে স্বাভাবিক করে তোলার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দময়ন্তী পুলিশকে জানিয়েছেন, হাওড়া স্টেশন থেকে তিনি ট্রেনে করে শ্রীরামপুরে যান। সেখানে এক দক্ষিণ ভারতীয় মহিলার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই মহিলা দময়ন্তীকে আশ্রয় দেন, নতুন পোশাক দেন এবং খাবারের ব্যবস্থাও করেন। অচেনা শহরে ওই মহিলার সাহায্যই তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছে কিশোরী।
বাড়ি ফেরার পর দময়ন্তীকে হাওড়া থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন হাওড়া সিটি পুলিশের আধিকারিকেরা। তদন্তকারীরা তাঁর গত কয়েক দিনের গতিবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। হাওড়া সিটি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) তৌসিফ আলি আজাহার জানান, দময়ন্তী নিজেই ফিরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, পরিবারে খেলাধুলা এবং পড়াশোনা নিয়ে কিছু মতবিরোধ ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল। গত দু’দিনে সে কোথায় কোথায় ছিল এবং কীভাবে সময় কাটিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ হাওড়ার উমাচরণ ভট্টাচার্য লেনের বাড়ি থেকে দুধ কিনতে বেরিয়েছিল বছর পনেরোর দময়ন্তী। সে সময় তার কাছে মোবাইল ফোন বা টাকা-পয়সা কিছুই ছিল না। নাইটড্রেস পরেই বাড়ির কাছের দোকানে গিয়েছিল সে। সাধারণত সকাল ১০টার মধ্যে বাবার সঙ্গে অনুশীলনে যাওয়ার কথা থাকলেও সে আর বাড়ি ফেরেনি। এরপর পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করে। আশপাশে কোথাও সন্ধান না মেলায় হাওড়া থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।
দময়ন্তীকে খুঁজে বের করতে হাওড়া সিটি পুলিশের পক্ষ থেকে চারটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা, সম্ভাব্য রুটে তল্লাশি এবং বিভিন্ন সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত শনিবার ভোরে দময়ন্তী নিজেই ফিরে আসায় স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে। তবে কী কারণে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং এই সময়ের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত এখনও চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।





