বিট্টু দত্ত, কলকাতা ডেস্ক: প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবন আজ পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। একসময় মহাকাশকে শুধুই গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে ভাবা হলেও বর্তমানে সেখানে দীর্ঘ সময় বসবাস, কাজকর্ম, খাদ্য উৎপাদন এবং দৈনন্দিন নানা কার্যকলাপ চালানো সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) তারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে ভেসে থাকা এই গবেষণাগারে নভোশ্চররা মাসের পর মাস কাটান। তবে প্রশ্ন উঠেছে, মহাশূন্যে কি পৃথিবীর মতো খেলাধুলাও সম্ভব? বিশেষ করে ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলা কি ভারশূন্য পরিবেশে খেলা যেতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি এক অভিনব গবেষণায় নেমেছেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোশ্চররা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে বিশেষ পরীক্ষার উদ্দেশ্যে। এই বলকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে নানা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, চারজন মহাকাশচারী—দু’জন মহিলা ও দু’জন পুরুষ—ভারশূন্য অবস্থায় বিশ্বকাপের বলটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তাঁরা শূন্যে ভেসে থেকেই বলটিকে কিক করছেন এবং বলের গতিপথ ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। পৃথিবীতে ফুটবল লাথি মারলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে বল নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে। কিন্তু মহাকাশে সেই পরিচিত নিয়ম কার্যকর হয় না। ফলে বলের চলন, গতি ও ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের হয়ে ওঠে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বলটি খুব ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে এবং অল্প দূরত্ব অতিক্রম করতেও বেশ সময় নিচ্ছে। কারণ সেখানে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে পৃথিবীতে যে গতিবিজ্ঞানের সূত্র ফুটবলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মহাশূন্যে তা অনেকাংশেই বদলে যায়। বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, এমন পরিবেশে বল কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার গতি ও ঘূর্ণন কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান বা গতিবিজ্ঞানের ধারণা পাওয়া সম্ভব কি না।
এই গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের ক্ষেত্রে বিনোদন ও ক্রীড়াচর্চার নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচিত হতে পারে। পাশাপাশি ভারশূন্য পরিবেশে বস্তুর গতিবিধি সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘ট্রাইওন্ডা’ বলটিও বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। বিখ্যাত ক্রীড়া সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস এই বলটি তৈরি করেছে। এর নকশায় ফুটে উঠেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ঐক্যের প্রতীক। ‘ট্রাইওন্ডা’ নামটিও সেই ভাবনার প্রতিফলন। ‘ট্রাই’ অর্থ তিন এবং ‘ওন্ডা’ অর্থ তরঙ্গ। অর্থাৎ তিন দেশের প্রতিনিধিত্বকারী তিন রঙের তরঙ্গকে বোঝানো হয়েছে এই নামে।
বলটির গায়ে ব্যবহৃত লাল, সবুজ ও নীল রং যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। শুধু নকশাই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এটি অত্যন্ত আধুনিক। বলের মধ্যে বিশেষ সেন্সর বসানো হয়েছে, যা বলের গতি, স্পর্শ এবং চলাচল সংক্রান্ত নানা তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।
বর্তমানে মহাকাশে এই বলের ভারসাম্য ও গতিবিধি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এই পরীক্ষার ফলাফল শুধু মহাকাশবিজ্ঞানেই নয়, ভবিষ্যতের ক্রীড়া প্রযুক্তি উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ফুটবল আর বিজ্ঞান—দুই ভিন্ন জগতের এই মেলবন্ধন তাই ইতিমধ্যেই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।



