কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে রাস্তায় নামাজ ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হল তৃণমূল নেতা ও জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের (Siddiqullah Chowdhury)রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “২০০ জনের ধারণক্ষমতার একটি মন্দিরে যদি উৎসবের দিনে ৫,০০০ মানুষ আসেন, তবে কি তাঁদের ওপর বলপ্রয়োগ বা লাঠিচার্জ করা হবে?” এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক।
একটি ভিডিও বার্তায় সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী রাস্তায় নামাজ পড়া নিয়ে সরকারের কড়া অবস্থানের সমালোচনা করতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “রাস্তায় যেখানেই নামাজ পড়া হোক না কেন, সেটিকে একাধিক শিফটে আয়োজন করার বিষয় ভাবা যেতে পারে। যদি প্রতিবেশীদের অসুবিধা হয়, তাহলে তা আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। কিন্তু বলপ্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামলানো উচিত নয়।”
আরও দেখুনঃ চন্দ্রনাথ রথের গাড়ির চালককে দেখতে SSKM এ শুভেন্দু
তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার জনজীবন ব্যাহত করে রাস্তায় নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে কড়া নীতি গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা নামাজের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা তৈরি হলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। বিজেপির একাধিক বিধায়কও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, “রাস্তায় নামাজ” বা জনজীবন ব্যাহত করে কোনও ধর্মীয় কর্মসূচি বরদাস্ত করা হবে না।
এই প্রেক্ষাপটে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, তিনি কোনও ধর্মীয় তুলনা টানতে চাননি, বরং প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানবিক ও বাস্তবসম্মত সমাধানের কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বড় জমায়েতের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা উচিত, সরাসরি পুলিশি কড়াকড়ি নয়।
অন্যদিকে বিজেপির একাংশ এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাঁদের দাবি, মন্দিরের উৎসব এবং রাস্তায় নিয়মিত নামাজের তুলনা করা ঠিক নয়। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, জনসাধারণের রাস্তা কোনওভাবেই স্থায়ী ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের জায়গা হতে পারে না। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। রাস্তায় নামাজ, মাইক ব্যবহার, ধর্মীয় শোভাযাত্রা এসব বিষয় এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর মন্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিল বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে সিদ্দিকুল্লা তাঁর বক্তব্যে একটি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন। তিনি বলেন, বড় জমায়েত হলে নামাজ একাধিক পর্বে আয়োজন করা যেতে পারে, যাতে ভিড় কম হয় এবং সাধারণ মানুষেরও অসুবিধা না হয়। তাঁর মতে, প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেই এই ধরনের সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, জনসাধারণের রাস্তা ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং তা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই মন্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ সিদ্দিকুল্লার বক্তব্যকে “বাস্তবধর্মী” বলছেন, আবার কেউ একে “অযৌক্তিক তুলনা” বলে সমালোচনা করছেন। ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জনমতেও স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।




















