দেরাদুন: বঙ্গতনয় দীপক অধিকারী থেকে ‘দেব’, নাম বদলের গল্প বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় নতুন নয়। অভিনেতা-সাংসদ দেব নিজেই বহুবার বলেছেন, শৈশবের শখ থেকেই এই নাম গ্রহণ, আর সেই নামই নাকি তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে উঠেছে। তবে এবার নাম বদলের ঘটনা এল একেবারে অন্য প্রেক্ষাপটে, অন্য রাজ্য থেকে। বাংলা বা বাঙালির সঙ্গে কোনও যোগ না থাকলেও ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন উত্তরাখণ্ডের দীপক কুমার, যিনি এখন নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন ‘দীপক মহম্মদ’ নামে।
ঘটনার সূত্রপাত উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) কোটদ্বার শহরের এক ছোট পোশাকের দোকানকে ঘিরে বিতর্ক থেকে। দেশের ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের দিন, কোটদ্বারে ‘বাবা স্কুল গার্মেন্টস’ নামে একটি দোকানের নাম নিয়ে আপত্তি তোলে কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তাঁদের দাবি ছিল, ‘বাবা’ শব্দটি হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত এবং সিদ্ধবলী বাবা হনুমান মন্দিরের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকায় কোনও মুসলিম ব্যবসায়ীর এই নাম ব্যবহার করা উচিত নয়।
আরও পড়ুন
গেরুয়া রাজ্যে গণধর্ষণের শিকার নাবালিকা! নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল
বাঙালি পরিচালিত বিজেপি নিয়ন্ত্রিত গ্রাম পঞ্চায়েত দেশের সেরা
দোকানটির মালিক ভাকিল আহমেদের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তাঁর দোকান চলছে এবং এতদিন কেউ নাম নিয়ে আপত্তি তোলেনি। তাঁর দাবি, ‘বাবা’ শব্দটি কোনও একটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সব ধর্মেই এই শব্দের ব্যবহার রয়েছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় জিম ট্রেনার দীপক কুমার। বজরং দলের সদস্য ও অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে, উত্তেজনা যখন চরমে, তখন তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। সেই মুহূর্তেই তিনি নিজেকে পরিচয় দেন ‘মহম্মদ দীপক’ নামে। এই নামই মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। ‘Mohammad Deepak’ নামটি ঘিরে শুরু হয় রিল, পোস্ট, বিতর্ক ও তুমুল আলোচনা।
আরও পড়ুন
১৬৩৮ টি বৈধ ক্রেডিট কার্ড নিয়ে গিনেসবুকে হায়দরাবাদের মনীশ
বাঙালি পরিচালিত বিজেপি নিয়ন্ত্রিত গ্রাম পঞ্চায়েত দেশের সেরা
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপক ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি ওই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর কথায়, “আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি না হিন্দু, না মুসলিম, না শিখ, না খ্রিস্টান।” তিনি বলেন, যখন দোকান মালিকের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছিল, তখন তাঁর মাথায় হঠাৎই ‘মহম্মদ দীপক’ নামটি আসে। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি শুধুই একজন ভারতীয় নাগরিক এবং এই দেশে প্রত্যেকের শান্তিতে বাঁচার অধিকার রয়েছে।
দীপকের মতে, “সবচেয়ে বড় ধর্ম মানবতা। মৃত্যুর পর মানুষকে তার কাজ দিয়েই বিচার করা হয়।” ঘৃণা ছড়িয়ে কোনও লাভ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই ঘটনার পর থেকে দীপকের জীবন পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। একদিকে যেমন দেশজুড়ে সমর্থন ও ভালোবাসার বার্তায় ভাসছেন, তেমনই অন্যদিকে তার প্রভাব পড়েছে তাঁর রোজগারে। প্রায় ৩০ বছর ধরে ফিটনেসের সঙ্গে যুক্ত দীপক কোটদ্বারের বদরীনাথ রোডের কাছে একটি জিম চালান। তবে ঘটনার পর থেকে সেই জিম বন্ধ রয়েছে।
দীপকের পারিবারিক পটভূমিও বেশ সাধারণ। প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁর বাবা প্রয়াত হয়েছেন। স্ত্রী, এক কন্যা এবং মা, এই নিয়েই তাঁর সংসার। এখনও কোটদ্বারে একটি চায়ের দোকান চালান তাঁর মা। বর্তমানে সেই চায়ের দোকানের আয়েই কোনওরকমে সংসারের খরচ চলছে।
সব বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও দীপক মহম্মদ মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ঘৃণার বদলে বোঝাপড়া ও সহানুভূতি বেছে নেওয়ার জন্য। তাঁর কথায়, “এই দেশে প্রত্যেকের নিজের ধর্ম পালন করার, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। আমি চাই মানুষ সঠিক পথ বেছে নিক, ভুল পথে না হাঁটে।”




















