হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিন আর চাইনিজ প্যাঙ্গোলিন এক নয়, গবেষণায় মিলল আলাদা প্রজাতির স্বীকৃতি

নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায় হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনকে চাইনিজ প্যাঙ্গোলিন থেকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

himalayan-pangolin-recognized-as-distinct-species-new-study

কলকাতা: দীর্ঘদিন ধরে হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনকে (Himalayan Pangolin) চাইনিজ প্যাঙ্গোলিনের একটি উপপ্রজাতি (Subspecies) হিসেবে ধরা হতো। তবে নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায় সেই ধারণা বদলে গেল। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিন (Manis aurita) একটি স্বতন্ত্র জীবিত প্রজাতি, যা চাইনিজ প্যাঙ্গোলিন (Manis pentadactyla) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল Communications Biology জার্নালে এই গবেষণার ফল প্রকাশ করেছে। গবেষণায় জিনগত (Genomic) ও শারীরিক (Morphological) বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন এবং সবচেয়ে বেশি চোরাশিকার হওয়া প্রাণীগুলির মধ্যে একটি এই প্রজাতির সংরক্ষণে এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

   

প্রায় ১৯০ বছরের পুরনো নমুনা বিশ্লেষণে মিলল নতুন তথ্য

গবেষকরা ১৮৩৬ সালে সংগ্রহ করা মূল নমুনা (Lectotype)-এর ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন এবং সেটির সঙ্গে আধুনিক নমুনার তুলনা করেন। সেই বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে (১.৮ মিলিয়ন বছর) প্রাথমিক প্লাইস্টোসিন যুগে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ান ও চাইনিজ প্যাঙ্গোলিনের পূর্বপুরুষ দুটি ভিন্ন বিবর্তনীয় পথে এগিয়ে যায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সেই সময় পৃথিবীর জলবায়ুতে বড় পরিবর্তন হচ্ছিল। উষ্ণ পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত প্যাঙ্গোলিনের পূর্বপুরুষদের একাংশ পশ্চিমে হিমালয় অঞ্চলে এবং অন্য অংশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই নতুন প্রজাতির জন্ম দেয়।

জলবায়ুর পরিবর্তনে কমেছে জনসংখ্যা

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনের সংখ্যা অতীতের একাধিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বিশেষ করে প্রাথমিক প্লাইস্টোসিন যুগের তীব্র শীতলতা এবং শুষ্ক আবহাওয়া এই প্রাণীর জনসংখ্যায় বড় ধাক্কা দেয়। পরে ১৪শ শতকে হিমালয় অঞ্চলে লিটল আইস এজ শুরু হওয়ার সময়ও এই প্রজাতির জনসংখ্যা আরও সংকুচিত হয়েছিল বলে জিনগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

শারীরিক গঠনেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য

গবেষণায় শুধু জিনগত নয়, শারীরিক গঠনেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিন গড়ে ৯৫.২ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। অন্যদিকে চাইনিজ প্যাঙ্গোলিনের গড় দৈর্ঘ্য ৭১.২ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ নতুন স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রজাতি আকারে অনেক বড়।

এছাড়া হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনের মাথার খুলি তুলনামূলকভাবে বড় হলেও কান ছোট। নাকের হাড়ও চাইনিজ প্যাঙ্গোলিনের তুলনায় ছোট ও চওড়া।

কোথায় পাওয়া যায় এই বিরল প্রাণী?

গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনের বিস্তৃতি মূলত দক্ষিণ হিমালয়ের পাদদেশে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে নেপাল, দক্ষিণ তিব্বত এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে অসমে এই প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকা এবং আরাকান পর্বতমালা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে এই প্রজাতি অন্য প্যাঙ্গোলিন থেকে আলাদা বিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে।

অবৈধ পাচার এখনও সবচেয়ে বড় হুমকি

হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিন বর্তমানে অবৈধ বন্যপ্রাণী পাচারের বড় শিকার। গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এই প্রজাতির দেহাংশ অবৈধভাবে সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রিত ঐতিহ্যবাহী ওষুধের বাজারেও প্রবেশ করছে। অর্থাৎ অবৈধভাবে সংগ্রহ করা প্রাণিজ উপাদান বৈধ সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা CITES Appendix I-এর আওতায় হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনকে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রজাতি সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা পাবে।

আরেকটি উদ্বেগ, আত্মীয়ের মধ্যেই প্রজনন

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনের কিছু জনসংখ্যার মধ্যে আত্মীয়ের মধ্যেই প্রজননের (Inbreeding) হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

বিশেষ করে কাঠমান্ডু উপত্যকা সংলগ্ন এলাকায় এই সমস্যা বেশি দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে জিনগত বৈচিত্র্য কমছে, যা ভবিষ্যতে প্রজাতিটির টিকে থাকার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ান প্যাঙ্গোলিনকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু প্রাণীবিজ্ঞানের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এই বিরল ও বিপন্ন প্রাণীর সংরক্ষণ, পাচার রোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।