পরপর দুই গোল্ডেন গ্লাভস, স্বপ্ন-সংগ্রামে উজ্জ্বল মোহনবাগানের প্রিয়াংশ দুবে

বিট্টু দত্ত, কলকাতা: রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন ডেভেলপমেন্ট লিগে পরপর দুইবার গোল্ডেন গ্লাভস জিতে নজর কেড়েছেন মোহনবাগানের তরুণ গোলরক্ষক প্রিয়াংশ দুবে। নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যাওয়া এই প্রতিভাবান ফুটবলার ইতিমধ্যেই ...

By Kolkata24x7 Team

Published:

Follow Us
priyansh-dubey-golden-gloves-mohun-bagan-interview-journey

বিট্টু দত্ত, কলকাতা: রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন ডেভেলপমেন্ট লিগে পরপর দুইবার গোল্ডেন গ্লাভস জিতে নজর কেড়েছেন মোহনবাগানের তরুণ গোলরক্ষক প্রিয়াংশ দুবে। নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যাওয়া এই প্রতিভাবান ফুটবলার ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁর আছে। দুরন্ত রিফ্লেক্স, ঠান্ডা মাথা আর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে আলাদা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। মাঠে আত্মবিশ্বাসী প্রিয়াংশ, মাঠের বাইরে একেবারে সাধারণ ও পরিশ্রমী ছেলে। ছোট শহর থেকে বড় স্বপ্ন নিয়ে উঠে আসা এই ফুটবলারের গল্প অনুপ্রেরণার। তাঁর যাত্রা, সংগ্রাম, পছন্দ-অপছন্দ এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়েই আজকের এই বিশেষ আলাপচারিতা।

প্রশ্ন ১: পরপর দু’বার গোল্ডেন গ্লাভস জেতার অনুভূতি কেমন?

প্রিয়াংশ দুবে: সত্যি বলতে, এই অনুভূতি ভাষায় বোঝানো কঠিন। একজন গোলরক্ষক হিসেবে গোল না খাওয়াই আমার প্রথম দায়িত্ব। তাই যখন টুর্নামেন্ট শেষে সেরা গোলকিপার হিসেবে নাম ঘোষণা হয়, মনে হয় পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। পরপর দু’বার গোল্ডেন গ্লাভস জেতা মানে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা, আর সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমি জানি, এই পুরস্কারের পেছনে শুধু আমি নই, আমার পুরো ডিফেন্স লাইন, কোচিং স্টাফ এবং টিমমেটদের অবদান আছে। মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়ে এই সম্মান পাওয়া আরও বিশেষ। ছোটবেলায় টিভিতে বড় ক্লাবের ম্যাচ দেখতাম, আজ সেই ক্লাবের জার্সিতে ট্রফি জিতছি—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। তবে আমি এখনও শুরুতেই আছি।

   

প্রশ্ন ২: আপনার ফুটবল যাত্রা কোথা থেকে শুরু?

প্রিয়াংশ দুবে: আমার জন্ম কর্ণাটকে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোর প্রতি খুব টান ছিল। প্রথমে অন্য বাচ্চাদের মতো আমিও মাঠে ফরোয়ার্ড হয়ে গোল করতে চাইতাম। কিন্তু একদিন স্কুল টুর্নামেন্টে গোলকিপার না থাকায় আমাকে পোস্টে দাঁড় করানো হয়। সেদিনই যেন নতুন একটা রাস্তা খুলে গেল। সবাই বলল, আমার রিফ্লেক্স ভালো, ঝাঁপ দেওয়ার সাহস আছে। তারপর থেকেই গোলকিপিংয়ের দিকে মন দিই। পরিবারও খুব সমর্থন করেছে। ভোরবেলা প্র্যাকটিসে নিয়ে যাওয়া, পড়াশোনার সঙ্গে সময় মেলানো—সবকিছুতে বাবা-মা পাশে ছিলেন। পরে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন ইয়ং চ্যাম্পসের মতো উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় সুযোগ পাই। সেখানে পেশাদার কোচদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সেই জায়গাটাই আমাকে বদলে দেয়। এরপর ধাপে ধাপে সুযোগ আসে মোহনবাগানে।

প্রশ্ন ৩: গোলরক্ষক হওয়ার জন্য কী কী গুণ সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন?

প্রিয়াংশ দুবে: গোলরক্ষক হওয়া শুধু বল বাঁচানো নয়, এটা মানসিকতার খেলা। একজন গোলকিপারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। ৮৫ মিনিট বল না এলেও ৮৬ মিনিটে একটা সেভ ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই ফোকাস সবচেয়ে বড় গুণ। দ্বিতীয়ত সাহস। কারণ স্ট্রাইকারের সামনে ঝাঁপ দিতে ভয় পেলে গোলকিপার হওয়া যায় না। তৃতীয়ত যোগাযোগ দক্ষতা। ডিফেন্ডারদের সঙ্গে সবসময় কথা বলতে হয়, কে কোথায় দাঁড়াবে, কোথা থেকে বিপদ আসছে—সব বুঝিয়ে দিতে হয়। আমি সবসময় চেষ্টা করি পিছন থেকে দলকে গাইড করতে। এছাড়া ফিটনেস, রিফ্লেক্স, বল কন্ট্রোল এবং পায়ের কাজ এখন আধুনিক ফুটবলে খুব জরুরি।

প্রশ্ন ৪: মোহনবাগানে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

প্রিয়াংশ দুবে: মোহনবাগানে আসা আমার জীবনের অন্যতম বড় মুহূর্ত। এই ক্লাবের ইতিহাস, সমর্থকদের আবেগ, ট্রফির ঐতিহ্য—সবকিছু আলাদা। প্রথম দিন ক্লাবের পরিবেশ দেখে বুঝেছিলাম, এখানে শুধু খেললেই হবে না, জিততেও হবে। সেই চাপই আসলে খেলোয়াড়কে বড় করে তোলে। যখন প্রথমবার সবুজ-মেরুন জার্সি পরে মাঠে নামি, গায়ে কাঁটা দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, কত বড় বড় কিংবদন্তি এই জার্সি পরে খেলেছেন! অনুশীলনে সিনিয়রদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। এখানে প্রতিটি সেশন খুব প্রতিযোগিতামূলক। কেউ কাউকে জায়গা ছাড়ে না। সেই কারণেই উন্নতি দ্রুত হয়। সমর্থকদের ভালোবাসাও আলাদা শক্তি দেয়।

প্রশ্ন ৫: মাঠের বাইরে প্রিয়াংশ দুবে কেমন মানুষ?

প্রিয়াংশ দুবে: মাঠে আমি খুব সিরিয়াস থাকি, কিন্তু মাঠের বাইরে আমি একেবারে সাধারণ ছেলে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প করা, গান শোনা, সিনেমা দেখা—এসব আমার খুব পছন্দ। ভ্রমণও ভালো লাগে, বিশেষ করে নতুন শহরে গেলে স্থানীয় সংস্কৃতি দেখতে চেষ্টা করি। আমি খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ। বেশি হৈচৈ পছন্দ করি না। ফাঁকা সময়ে ম্যাচের ভিডিও দেখি, বিশেষ করে বড় বড় গোলকিপারদের সেভ। তাতে শেখার সুযোগ থাকে। অনেকেই ভাবে ফুটবলার মানেই সবসময় ব্যস্ত জীবন, কিন্তু আসলে আমরা সাধারণ আনন্দেও খুশি থাকি। আমি নিজের শিকড় ভুলতে চাই না। কোথা থেকে এসেছি, কতটা লড়াই করে এখানে পৌঁছেছি—সেটা সবসময় মনে রাখি। সেটাই আমাকে মাটিতে রাখে।

প্রশ্ন ৬: আপনার পছন্দের খাবার কী? ডায়েট কীভাবে মেনে চলেন?

প্রিয়াংশ দুবে: আমি খাবার খুব ভালোবাসি, তবে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে এখন অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয়। বাড়ির রান্না আমার সবচেয়ে প্রিয়। ডাল-ভাত, চিকেন, রুটি—এই সাধারণ খাবারই সবচেয়ে ভালো লাগে। কর্ণাটকের কিছু স্থানীয় খাবারও খুব পছন্দ করি। মাঝে মাঝে বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সেটা সবসময় সম্ভব হয় না। ম্যাচের আগে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খাই—পাস্তা, ফল, ডিম, চিকেন এসব বেশি থাকে। জল খাওয়ার দিকেও খুব নজর রাখি। আমাদের শরীরই আসল সম্পদ, তাই কী খাচ্ছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঝে মাঝে ‘চিট মিল’ দরকার হয়, কারণ মানসিক তৃপ্তিও জরুরি। আমি বিশ্বাস করি ব্যালান্স খুব দরকার।

প্রশ্ন ৭: কোন গোলকিপারকে অনুসরণ করেন?

প্রিয়াংশ দুবে: আমি ছোটবেলা থেকে অনেক গোলকিপারকে দেখেছি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যানুয়েল নয়ারকে খুব পছন্দ করি। ওনার সুইপার-কিপার স্টাইল আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করে। শুধু পোস্টের নিচে নয়, পুরো ডিফেন্স নিয়ন্ত্রণ করা—এটা অসাধারণ। এছাড়া আলিসন ও থিবো কুর্তোয়ার ম্যাচও দেখি। ভারতের মধ্যে অনেক সিনিয়র গোলকিপারের খেলা দেখে শিখেছি। বিশেষ করে চাপের ম্যাচে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, সেটা শেখার বিষয়। আমি কারও কপি হতে চাই না, নিজের আলাদা পরিচয় গড়তে চাই। তবে বড়দের দেখে শেখা সবসময় দরকার। ভিডিও দেখে বুঝি তারা পজিশনিং কীভাবে নেয়, কর্নারে কীভাবে বেরোয়, এক বনাম এক পরিস্থিতি কীভাবে সামলায়।

প্রশ্ন ৮: আগামী দিনে নিজের লক্ষ্য কী?

প্রিয়াংশ দুবে: আমার প্রথম লক্ষ্য মোহনবাগানের সিনিয়র দলে নিয়মিত জায়গা করে নেওয়া। বড় মঞ্চে খেলতে চাই, বড় ম্যাচে দায়িত্ব নিতে চাই। এরপর জাতীয় দলে খেলাটা স্বপ্ন। দেশের জার্সি পরে জাতীয় সঙ্গীত শোনা, এটা যে কোনো ফুটবলারের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। আমি জানি পথ সহজ নয়। প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে, নতুন প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু আমি পরিশ্রমে বিশ্বাস করি। গোল্ডেন গ্লাভস জেতা ভালো, কিন্তু ক্যারিয়ার শুধু পুরস্কারে মাপা যায় না। আমি চাই মানুষ বলুক, এই ছেলে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ভালো খেলতে চাই, চোট এড়িয়ে এগোতে চাই, আর তরুণদের অনুপ্রেরণা হতে চাই। এখনই থামার সময় নয়, এখন তো আসল পথচলা শুরু।

পরপর দুইবার গোল্ডেন গ্লাভস জেতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, প্রিয়াংশ দুবের কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং স্বপ্নপূরণের প্রতীক। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, প্রতিভার সঙ্গে নিষ্ঠা থাকলে সাফল্য একদিন দরজায় কড়া নাড়বেই। মোহনবাগানের জার্সিতে তিনি ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতের ভরসা হয়ে উঠছেন। মাঠে আত্মবিশ্বাসী, বাইরে নম্র—এই গুণই তাঁকে আরও বড় জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। সামনে সিনিয়র দল, জাতীয় দল এবং আরও বড় মঞ্চের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। যদি একইভাবে পরিশ্রম চালিয়ে যান, ভারতীয় ফুটবল খুব শিগগিরই পেতে পারে এক নির্ভরযোগ্য প্রহরী।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Kolkata24x7 Team

আমাদের প্রতিবেদন গুলি kolkata24x7 Team এর দ্বারা যাচাই করে লেখা হয়। আমরা একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম যা পাঠকদের জন্য স্পষ্ট এবং সঠিক খবর পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য এবং সাংবাদিকতার মান সম্পর্কে জানতে, অনুগ্রহ করে আমাদের About us এবং Editorial Policy পৃষ্ঠাগুলি পড়ুন।

Follow on Google