বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে উত্তেজনার আবহের মধ্যেই রবিবার রাতে কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। তৃণমূলের অভিযোগ, বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আটকাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত “হাউস অ্যারেস্ট” করা হয়েছিল। যদিও সোমবার সকাল হতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কেবল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বহাল থাকে।
রবিবার সকালে বারুইপুরে এক নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। মৃতদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা দেহ আটকে বিক্ষোভ দেখান। অভিযোগ, এক অভিযুক্তকে গণপিটুনিও দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এই ঘটনার পর নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ফোনে মৃতার বাবার সঙ্গে কথাও বলেন বলে জানান। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যার পর থেকেই কালীঘাটে তাঁর বাড়ির সামনে বাড়তি পুলিশি তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের আইটি সেলও সেই ছবি শেয়ার করে দাবি করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাইরে যেতে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে বারুইপুরে যেতে না দেওয়ার জন্যই বাড়ির চারপাশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, তিনি শুধুমাত্র নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন এবং একাই সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
ফেসবুক লাইভে তিনি বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। অতীতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভগবানপুর, পটাশপুর, কোচবিহার, দুর্গাপুর, বেহালা, দিনহাটা ও পানিহাটিসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। তাঁর মতে, বারুইপুরের ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে এবং সেই কারণেই পরিস্থিতি এত উত্তপ্ত হয়েছে।
‘হাউস অ্যারেস্ট’-এর অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি কখনওই অশান্তি বা সংঘর্ষে বিশ্বাস করেন না। শান্তিপূর্ণভাবে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাবি, বাড়ির সামনে এবং আশপাশের রাস্তায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, সিআরপিএফ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমাদের নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে শুনছি। মুখে কেউ না বললেও বাস্তবে এটিই হাউস অ্যারেস্টের মতো পরিস্থিতি।”
তবে এই অভিযোগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায়। সূত্রের খবর, রবিবার গভীর রাত থেকেই কালীঘাটের বাড়ির সামনে থেকে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। সোমবার সকালে সেখানে শুধুমাত্র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বরাদ্দ নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাই দেখা যায়। ফলে রবিবার রাতের ঘটনাকে ঘিরে শুরু হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
এদিকে বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাউস অ্যারেস্ট’ সংক্রান্ত অভিযোগ ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।


