বিট্টু দত্ত, কলকাতা: বাংলার খেলাধুলার ভবিষ্যৎ, বিজেপির পরিকল্পনা, খেলো ইন্ডিয়া প্রকল্পে রাজ্যের ভূমিকা এবং যুবসমাজকে ক্রীড়ামুখী করার ভাবনা, এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কোলকাতার একটি অনুষ্ঠানে মুখ খুললেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজু। একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এল তাঁর পরিকল্পনা, প্রত্যাশা ও বাংলাকে ঘিরে বার্তা।
প্রশ্ন ১: আপনি বলেছেন বাংলায় বিজেপি সরকার এলে খেলাধুলোর উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। ঠিক কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
কিরেন রিজিজু: বাংলা ভারতের ক্রীড়া মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক রাজ্য। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স থেকে শুরু করে নানা খেলায় বাংলার অবদান অসাধারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারাবাহিকতা কিছুটা কমেছে। আমরা চাই বাংলার হারানো ক্রীড়া গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যদি জনগণ আমাদের সুযোগ দেন, তাহলে প্রথম লক্ষ্য হবে গ্রাসরুট স্তরে খেলাধুলোর পরিবেশ তৈরি করা। প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় আধুনিক স্টেডিয়াম, ট্রেনিং সেন্টার, জিমনেসিয়াম এবং কোচিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ছোট বয়স থেকেই চিহ্নিত করে তাদের বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। অনেক প্রতিভা শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। আমরা সেটা বদলাতে চাই। তৃতীয়ত, বাংলার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় লিগ, স্কুল টুর্নামেন্ট ও ক্লাব ফুটবলকে নতুনভাবে সাজানো হবে। আমাদের বিশ্বাস, খেলাধুলা শুধু পদক জেতার বিষয় নয়, এটা যুবসমাজকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার শক্তি। তাই বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী করতে ক্রীড়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রশ্ন ২: আপনি বাংলার খেলাধুলার ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। কোন দিকগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?
কিরেন রিজিজু: বাংলার নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে আবেগ, সংস্কৃতি আর সংগ্রামের ইতিহাস। খেলাধুলার ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। কলকাতা এমন একটি শহর যেখানে ফুটবল শুধুমাত্র খেলা নয়, মানুষের জীবনযাত্রার অংশ। Mohun Bagan Super Giant, East Bengal FC, Mohammedan Sporting Club, এই ক্লাবগুলোর ইতিহাস শুধু বাংলার নয়, গোটা ভারতের গর্ব। বাংলা বহু মহান খেলোয়াড় দিয়েছে, যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, সব ক্ষেত্রেই বাংলার অবদান আছে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে খেলাকে ঘিরে মানুষের যে আবেগ, সেটা অন্য রাজ্যের কাছে উদাহরণ হতে পারে।আমাকে অনুপ্রাণিত করে এখানকার সাধারণ মানুষ। তারা খেলোয়াড়দের শুধু সমর্থন করেন না, নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসেন। সেই সংস্কৃতি যদি সঠিক পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক সহায়তা পায়, তাহলে বাংলা আবার দেশের অন্যতম ক্রীড়া শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আমি মনে করি, বাংলার অতীত গৌরবই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করলেই নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব।
প্রশ্ন ৩: আপনি ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে বাংলার অংশগ্রহণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কেন?
কিরেন রিজিজু: “খেলো ইন্ডিয়া” শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি দেশের ক্রীড়া বিপ্লবের ভিত্তি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভা তুলে এনে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করা। অনেক রাজ্য এই প্রকল্পকে গ্রহণ করেছে এবং তার সুফলও পেয়েছে। কিন্তু বাংলা, যার ক্রীড়া ঐতিহ্য এত সমৃদ্ধ, সেখানে প্রত্যাশামতো আগ্রহ দেখা যায়নি, এটাই আমার আক্ষেপ। বাংলার বহু প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ে আছে। যদি তারা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুযোগ, স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুবিধা পুরোপুরি পেত, তাহলে আরও অনেক সাফল্য আসত। আমি মনে করি, প্রশাসনিক অনীহা বা সমন্বয়ের অভাবে কিছু সুযোগ নষ্ট হয়েছে।তবে আমি এটাও বলব, বিষয়টি শুধুমাত্র সমালোচনার নয়। আমরা চাই ভবিষ্যতে বাংলা আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হোক। কারণ ক্রীড়া উন্নয়ন রাজনৈতিক সীমার বাইরে। যদি সব স্তরের সরকার একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে খেলোয়াড়রাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।আমার লক্ষ্য কাউকে দোষ দেওয়া নয়, বরং বাংলার প্রতিভাবান যুবকদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া।
প্রশ্ন ৪: বাংলার যুবসমাজকে খেলাধুলার দিকে টানতে কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
কিরেন রিজিজু: আজকের দিনে যুবসমাজকে শুধু বইয়ের পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। খেলাধুলা শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। বাংলার যুবকদের মধ্যে প্রতিভা, আবেগ ও পরিশ্রম, সবই আছে। দরকার সঠিক দিশা ও সুযোগ। প্রথমত, স্কুল স্তর থেকেই স্পোর্টস কালচার তৈরি করতে হবে। নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষিত কোচ এবং মানসম্মত মাঠ থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের মানসিকতা বদলাতে হবে। অনেকেই মনে করেন খেলাধুলায় ভবিষ্যৎ নেই, কিন্তু এখন ক্রীড়াও বড় পেশা হতে পারে। তৃতীয়ত, প্রতিটি জেলায় স্পোর্টস একাডেমি তৈরি করতে হবে, যেখানে গ্রামাঞ্চলের ছেলেমেয়েরাও সুযোগ পাবে। শুধু শহরকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হলে হবে না। চতুর্থত, মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, খেলাধুলা যুবকদের মাদক, হতাশা ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখে। তাই বাংলার যুবসমাজকে এগিয়ে নিতে ক্রীড়াকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
প্রশ্ন ৫: বাংলার মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
কিরেন রিজিজু: বাংলার মানুষ সবসময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিন্তা, আন্দোলন এবং খেলাধুলায়। এই রাজ্যের মাটি প্রতিভাবান মানুষের জন্ম দেয়। তাই আমার বার্তা খুব স্পষ্ট, বাংলা আবার পারবে। আজ প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। বাংলার যুবকদের আমি বলতে চাই, বড় স্বপ্ন দেখুন। মাঠে নামুন, পরিশ্রম করুন, শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। সুযোগ এলে তাকে কাজে লাগান। সরকার, সমাজ ও পরিবার, সবাই যদি পাশে থাকে, তাহলে কোনও প্রতিভা আটকে থাকবে না।আমি বাংলার মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে বাংলার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলার ক্ষেত্রে বাংলা আবার জাতীয় নেতৃত্ব নিতে পারে। ফুটবল, ক্রিকেট, অলিম্পিক স্পোর্টস, সব জায়গাতেই নতুন সাফল্য সম্ভব। বাংলা শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে বাঁচবে না, ভবিষ্যতের জয়গাথাও লিখবে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক দিশা ও সম্মিলিত প্রয়াস থাকলে বাংলার ক্রীড়া জগতে নতুন সূর্যোদয় খুব দূরে নয়।




















