বিট্টু দত্ত, কলকাতা: ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম রহিম নবী। স্ট্রাইকার থেকে ডিফেন্ডার—সব ভূমিকাতেই সফল এই বহুমুখী ফুটবলার দেশের জার্সিতেও উজ্জ্বল ছিলেন। দীর্ঘ কেরিয়ারের স্মৃতি, সংগ্রাম, সাফল্য এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে খোলামেলা কথোপকথনে মুখ খুললেন প্রাক্তন তারকা রহিম নবী।
প্রশ্ন ১: আপনার ফুটবল যাত্রার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? টাটা ফুটবল একাডেমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আপনার যাত্রায়?
রহিম নবী: আমার ফুটবল জীবনের আসল ভিত গড়ে উঠেছিল ছোটবেলাতেই। পাড়ায়, মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে বল খেলতে খেলতেই এই খেলাটার প্রেমে পড়ে যাই। পরে যখন Tata Football Academy-তে সুযোগ পেলাম, তখন বুঝলাম স্বপ্নকে সত্যি করতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, কঠোর পরিশ্রমও দরকার। সেখানে শৃঙ্খলা, ফিটনেস, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝা—সব কিছু খুব নিয়ম মেনে শেখানো হত। আমাদের শুধু ফুটবলার হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও তৈরি করা হত। সকালে অনুশীলন, বিকেলে আবার ট্রেনিং, মাঝে ভিডিও দেখে ভুল শুধরে নেওয়া—এই রুটিন আমাকে অনেক বদলে দিয়েছিল। আমি স্ট্রাইকার হিসেবে শুরু করলেও সেখানে শিখেছিলাম কীভাবে নিজের খেলাকে বদলাতে হয়, দলের প্রয়োজনে নতুন জায়গায় খেলতে হয়। আজ আমি যা কিছু হয়েছি, তার বড় অংশের কৃতিত্ব ওই অ্যাকাডেমির। ওখানেই আমি শিখেছিলাম, বড় খেলোয়াড় হতে গেলে আগে বড় মনের মানুষ হতে হয়।
প্রশ্ন ২: আপনি স্ট্রাইকার, মিডফিল্ডার, ডিফেন্ডার- সব জায়গায় খেলেছেন। এত পরিবর্তন কীভাবে মানিয়ে নিতেন?
রহিম নবী: সত্যি বলতে, আমি কখনও নিজেকে শুধু এক পজিশনের খেলোয়াড় ভাবিনি। কোচ যেখানে খেলিয়েছেন, আমি চেষ্টা করেছি সেরাটা দিতে। শুরুতে স্ট্রাইকার ছিলাম, গোল করার আনন্দ আলাদা। পরে মিডফিল্ডে নামলাম, তখন বুঝলাম খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা কত গুরুত্বপূর্ণ। আবার ডিফেন্সে বা ফুলব্যাকে খেলতে গিয়ে দায়িত্ববোধ আরও বেড়ে গেল। কারণ পিছনে একটা ভুল মানেই গোল খাওয়ার সম্ভাবনা।
আমি সবসময় মনে করতাম, দলের দরকারটাই আগে। নিজের পছন্দ-অপছন্দ পরে। এই মানসিকতাই আমাকে আলাদা জায়গায় খেলতে সাহায্য করেছে। অনেকে বলে পজিশন বদলালে সমস্যা হয়, কিন্তু আমি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছি। এতে খেলাটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। সামনে খেললে ডিফেন্ডারের চিন্তা বুঝেছি, পিছনে খেললে স্ট্রাইকারের ভাবনা বুঝেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক সম্পূর্ণ ফুটবলার বানিয়েছে।
প্রশ্ন ৩: East Bengal-এ যোগ দেওয়া আপনার কেরিয়ারে কতটা বড় মোড় ছিল?
রহিম নবী: East Bengal-এ যোগ দেওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ছিল। বড় ক্লাব মানে শুধু নাম নয়, প্রত্যাশার চাপও অনেক বেশি। সেখানে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় যে তুমি এই জার্সির যোগ্য। প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিলাম, এখানে শুধু ভালো খেললেই হবে না, ধারাবাহিক ভালো খেলতে হবে।
East Bengal আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, বড় ম্যাচ খেলার মানসিকতা দিয়েছে। কলকাতার ডার্বি খেলেছি, হাজার হাজার সমর্থকের সামনে মাঠে নেমেছি—এই অভিজ্ঞতা ভাষায় বোঝানো যায় না। গ্যালারির আওয়াজ শরীরে কাঁটা দেয়। জয় পেলে মানুষ মাথায় তুলে নেয়, হারলে সমালোচনাও করে। কিন্তু এসবই একজন ফুটবলারের শিক্ষা।
ওই ক্লাবে খেলতে খেলতেই আমি আরও দায়িত্বশীল হয়েছি। নিজের শরীর, অনুশীলন, খেলার বাইরে জীবন—সবকিছু নিয়েই সচেতন হয়েছি। তাই বলতে পারি, East Bengal আমার কেরিয়ারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন ৪: ভারতীয় দলের হয়ে খেলতে নামার অনুভূতি কেমন ছিল?
রহিম নবী: দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর অনুভূতি অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ক্লাব ফুটবলে আপনি একটা শহর বা সমর্থকদের প্রতিনিধিত্ব করেন, কিন্তু জাতীয় দলে নামলে পুরো দেশের আশা আপনার কাঁধে থাকে। জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় বুকের ভিতর আলাদা আবেগ কাজ করে।
আমি প্রথমবার মাঠে নামার দিনটা আজও ভুলিনি। মনে হচ্ছিল, এত বছরের পরিশ্রম সার্থক হল। পরিবার, কোচ, বন্ধুরা—সবার কথা মনে পড়ছিল। দেশের জন্য খেলতে গিয়ে ক্লান্তি বলে কিছু থাকে না। ব্যথা থাকলেও লুকিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে।
ভারতের হয়ে জেতা ট্রফিগুলো, বিশেষ করে Challenge Cup বা SAFF Championship, খুব স্মরণীয়। কারণ সেখানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়ার সুযোগ থাকে। জাতীয় দলের জার্সি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে—সম্মান, দায়িত্ব আর গর্ব।
প্রশ্ন ৫: ২০১২ সালে AIFF Player of the Year পাওয়া মুহূর্তটা কেমন ছিল?
রহিম নবী: ওই পুরস্কারটা আমার কাছে খুব বিশেষ। কারণ এটা শুধু একটা ট্রফি নয়, বছরের পর বছর পরিশ্রমের স্বীকৃতি। ফুটবলারের জীবন বাইরে থেকে যত সহজ মনে হয়, ভিতরে ততটাই কঠিন। চোট আছে, চাপ আছে, নিজের ফর্ম ধরে রাখার লড়াই আছে।
যখন শুনলাম আমাকে Player of the Year দেওয়া হচ্ছে, তখন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এত বড় সম্মান কি সত্যিই আমি পেলাম? পরে মঞ্চে উঠে ট্রফি হাতে নেওয়ার সময় অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছিল—ছোটবেলার মাঠ, অনুশীলনের দিন, হারার কষ্ট, ফিরে আসার লড়াই।
এই পুরস্কার আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছিল। বুঝেছিলাম, পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না। তবে আমি সবসময় বলি, ব্যক্তিগত পুরস্কার দল ছাড়া সম্ভব নয়। সতীর্থরা পাশে না থাকলে আমি কোনও দিন এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না।
প্রশ্ন ৬: আপনি বিদেশে ট্রায়ালেও গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন?
রহিম নবী: বিদেশে ট্রায়ালে যাওয়া আমার কাছে চোখ খুলে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ছিল। সেখানে গিয়ে বুঝেছিলাম ফুটবল কতটা পেশাদারভাবে চালানো হয়। অনুশীলনের গতি, ফিটনেসের মান, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি—সবকিছুই খুব উচ্চস্তরের।
আমি চেষ্টা করেছিলাম নিজের সেরাটা দিতে। যদিও শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়নি, কিন্তু আমি এটাকে ব্যর্থতা বলি না। কারণ ওই সফর আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। বুঝেছি কোথায় উন্নতি দরকার, ভারতীয় ফুটবলকে কোথায় পৌঁছতে হবে।
অনেকেই শুধু ফল দেখে বিচার করে, কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে আমি জানি অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে আমি আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম যে ভারতীয় ফুটবলাররাও প্রতিযোগিতা করতে পারে। শুধু আরও পরিকাঠামো, নিয়মিত সুযোগ আর সঠিক পরিকল্পনা দরকার।
প্রশ্ন ৭: মহামেডান স্পোটিং এ বারবার ফিরে গিয়েছেন। এই ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন?
রহিম নবী: Mohammedan Sporting আমার হৃদয়ের খুব কাছের ক্লাব। কেরিয়ারের শুরুতেই এখানে খেলেছি, তাই একটা আলাদা আবেগ তো থাকবেই। পরে আবার ফিরে এসেছি, কারণ মনে হয়েছিল এখনও কিছু দেওয়ার আছে।
এই ক্লাবের সমর্থকদের আবেগ অন্যরকম। তারা খেলাটাকে খুব কাছ থেকে ভালোবাসে। যখন মাঠে নামতাম, বুঝতে পারতাম মানুষ কত আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সেই দায়িত্বই আমাকে টানত।
ফিরে এসে আমি শুধু খেলতে চাইনি, তরুণদেরও সাহায্য করতে চেয়েছি। অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চেয়েছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, নিজের সাফল্যের পাশাপাশি নতুনদের পথ দেখানোও দায়িত্ব। Mohammedan আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। তাই এই ক্লাবের নাম শুনলেই এখনও অনেক স্মৃতি ফিরে আসে।
প্রশ্ন ৮: অবসরের পরে ভারতীয় ফুটবল নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
রহিম নবী: আমি চাই ভারতীয় ফুটবল শুধু এশিয়ায় নয়, বিশ্বের মঞ্চেও নিয়মিত জায়গা করে নিক। আমাদের প্রতিভার অভাব নেই, অভাব আছে ধারাবাহিক পরিকল্পনার। ছোট বয়স থেকে সঠিক কোচিং, ভালো মাঠ, বৈজ্ঞানিক ফিটনেস—এই জায়গাগুলোতে আরও কাজ করতে হবে।
আমি চাই বাংলা থেকেও আবার অনেক ফুটবলার জাতীয় দলে উঠুক। একসময় কলকাতা ছিল ভারতীয় ফুটবলের কেন্দ্র। সেই ঐতিহ্য ফিরুক। তরুণরা এখন অনেক সচেতন, তারা স্বপ্ন দেখে। তাদের সঠিক দিশা দিলে অনেক দূর যাবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে যদি সুযোগ পাই, কোচিং বা গ্রাসরুট স্তরে কাজ করতে চাই। কারণ আমি জানি একটা ছোট পরামর্শও কারও জীবন বদলে দিতে পারে। মাঠ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, এবার সময় ফিরিয়ে দেওয়ার।




















