ভগবদ্গীতা পড়ান ধর্মীয় শিক্ষা নয়! রায় হাই কোর্টের

চেন্নাই: ভগবদ্গীতা শিক্ষা কি ধর্মীয় কার্যকলাপ? (Bhagavad Gita is not religious)এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। আদালত জানিয়ে দিল, ভগবদ্গীতা পড়ানো…

madras-hc-bhagavad-gita-not-religious-fcra-ruling

চেন্নাই: ভগবদ্গীতা শিক্ষা কি ধর্মীয় কার্যকলাপ? (Bhagavad Gita is not religious)এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। আদালত জানিয়ে দিল, ভগবদ্গীতা পড়ানো বা তার দর্শন শেখানো কোনওভাবেই কোনও ট্রাস্টকে ‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান’ বানায় না। ফলে শুধুমাত্র গীতা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণ দেখিয়ে কোনও সংস্থার FCRA নথিভুক্তি বাতিল বা অস্বীকার করা যায় না।

বিচারপতি জি আর স্বামীনাথনের বেঞ্চ এই রায়ে মন্তব্য করেছে, ভগবদ্গীতাকে একমাত্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। আদালতের মতে, গীতা ভারতীয় সভ্যতা ও দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ যা জীবন, কর্তব্য, নৈতিকতা ও আত্মোপলব্ধির কথা বলে। তাই গীতা শিক্ষা মানেই ধর্মীয় প্রচার এই যুক্তি আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

Advertisements

এই মামলার সূত্রপাত হয় এক বেদান্ত-কেন্দ্রিক দাতব্য ট্রাস্টের আবেদন থেকে। ট্রাস্টটির FCRA রেজিস্ট্রেশন নবীকরণ বা অনুমোদনের আবেদন খারিজ করে দেয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, ওই ট্রাস্ট নাকি ‘ধর্মীয় প্রকৃতির কার্যকলাপে’ যুক্ত। এর বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয় সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট।

মামলার শুনানিতে বিচারপতি স্বামীনাথন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভগবদ্গীতা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়। এটি এমন এক দর্শনগ্রন্থ, যা মানবজীবনের সার্বজনীন প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজে।” আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, গীতার শিক্ষা কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের মাধ্যমে মানুষকে দায়িত্বশীল ও নৈতিক জীবনযাপনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় যা কোনও ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে।

আদালত এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে, ভারতীয় সভ্যতা হাজার বছরের পুরনো, এবং তার দর্শন কোনও একক ধর্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ নয়। গীতাকে শুধুমাত্র ‘হিন্দু ধর্মগ্রন্থ’ বলে সীমাবদ্ধ করা তার সার্বজনীন গুরুত্বকে খাটো করা হবে বলেও মন্তব্য করেন বিচারপতি।

এই প্রেক্ষিতে মাদ্রাজ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে নির্দেশ দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের FCRA রেজিস্ট্রেশনের আবেদন নতুন করে বিবেচনা করতে। আদালতের মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে আরও সংবেদনশীল ও যুক্তিনিষ্ঠ হতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে একাধিক মামলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষা বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ভারতীয় দর্শন, যোগ, বেদান্ত বা গীতা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দেবে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও এই রায় ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার একটি পরিণত ব্যাখ্যা যেখানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ মানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে সার্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে দেখা। সব মিলিয়ে, মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতীয় সভ্যতা ও দর্শনকে কীভাবে দেখা উচিত সেই প্রশ্নেও এক স্পষ্ট বার্তা। ভগবদ্গীতা যে কেবল উপাসনার গ্রন্থ নয়, বরং মানবজীবনের পথনির্দেশিকা এই স্বীকৃতি আদালতের ভাষাতেই এবার আইনি মর্যাদা পেল।