নয়াদিল্লি: সুইডেন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সিপ্রির Yearbook 2026 রিপোর্ট ( Nuclear Warheads)ঘিরে আন্তর্জাতিক কৌশলগত মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, শান্তিকালীন সময়ে প্রথমবারের মতো ভারত তার কিছু পরমাণু অস্ত্র সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করেছে। তবে একইসঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দেশের দীর্ঘদিনের ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পরমাণু হামলা না করার নীতিতে কোনও পরিবর্তন আসেনি। ফলে একদিকে যেমন ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির নতুন দিক সামনে এসেছে, অন্যদিকে দেশের পরমাণু নীতির ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সিপ্রি-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের মোট পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১৯০। এর মধ্যে ১২টি যুদ্ধাস্ত্রকে সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই অস্ত্রগুলি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অথবা প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় নির্দিষ্ট সামরিক ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে। বাকি ১৭৮টি অস্ত্র এখনও প্রচলিত পদ্ধতিতে নিরাপদ ভাণ্ডারে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পরমাণু নীতির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। এতদিন ধরে ধারণা ছিল যে শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে ভারত পরমাণু বোমা এবং সেগুলি বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা লঞ্চারকে আলাদা আলাদা স্থানে সংরক্ষণ করে। এই পদ্ধতির ফলে দুর্ঘটনাজনিত ব্যবহার বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যানিস্টারভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরমাণু সাবমেরিনের নিয়মিত টহল ভারতের কৌশলগত সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ক্যানিস্টার প্রযুক্তির ফলে ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ সময় প্রস্তুত অবস্থায় রাখা সম্ভব হয় এবং প্রয়োজনে দ্রুত মোতায়েন করা যায়। একইসঙ্গে সমুদ্রে টহলরত পরমাণু সাবমেরিন ভারতের দ্বিতীয় আঘাত হানার ক্ষমতাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ভারত এখন ধীরে ধীরে যুদ্ধাস্ত্র এবং লঞ্চারকে একত্রে প্রস্তুত রাখার নীতির দিকে এগোচ্ছে।
গত এক বছরে ভারতের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা ১৮০ থেকে বেড়ে ১৯০-এ পৌঁছেছে বলেও সিপ্রি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৃদ্ধি মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে প্রতিবেশী চিনের দ্রুত পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডরের প্রেক্ষাপটে ভারত তার প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে। সিপ্রি-র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চিনের হাতে প্রায় ৬২০টি এবং পাকিস্তানের হাতে প্রায় ১৭০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।
তবে এই সমস্ত প্রস্তুতির মধ্যেও ভারতের পরমাণু নীতির মূল ভিত্তি অপরিবর্তিত রয়েছে। ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি অনুযায়ী, ভারত কোনও দেশের বিরুদ্ধে আগে থেকে পরমাণু হামলা চালাবে না। শুধুমাত্র ভারতের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হলে বা দেশের নিরাপত্তা চরমভাবে বিপন্ন হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। এই নীতিকে ভারতের কৌশলগত অবস্থানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একইসঙ্গে ভারত ‘বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম প্রতিরোধ’ বা Credible Minimum Deterrence নীতিও অনুসরণ করে চলেছে। এর অর্থ, পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধির লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়; বরং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তাই সক্রিয় মোতায়েনের সংখ্যা বাড়লেও ভারতের সামগ্রিক বার্তা স্পষ্ট দেশ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও আধুনিক করছে, কিন্তু আগে আঘাত করার নীতিতে বিশ্বাসী নয়।




















