Pataliputra: পুরুলিয়ার মাঠে,ঝোপে পড়েছিল হাজার হাজার গুলি-এ কে ৪৭, কিম ডেভির বন্ধু ছিল পাপ্পু

84
Pataliputra Special story

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: অবশেষে পাপ্পু যাদব পূর্ণিয়ার দখল নিল। জেল হোক বা বাইরে-তার সমান প্রভাব। রোখ যার, বিহার তার এই গুণের অধিকারী পাপ্পু। পূর্ণিয়ার কমিউনিস্ট বিধায়ক অজিত সরকার খুনের মামলায় জেল খাটা ছাড়াও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ‘পুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ’  মামলায় তার নাম এসেছে। ভারতের মাফিয়াদের মধ্যে একমাত্র ডন দাউদ ইব্রাহিম ছাড়া পাপ্পুর নামটি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। এই ‘কৌলিন্য’ বাকিদের কাছে অবশ্যই  হিংসার কারণ। পাটলিপুত্রের (Pataliputra)  যুদ্ধ কাহিনীতে আবার একবার পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়া যাক।

পুরুলিয়া। ১৯৯৫
ঠাণ্ডায় গুটিয়ে ছিল পুরুলিয়া। ১৭ ডিসেম্বর। রাতভর কাঁপুনি দিয়ে ভোরে আরও জেঁকে বসেছে শীত। একটু একটু করে দিনের আলো স্পষ্ট হতেই হাড় হিম হয়ে গেছিল ঝালদার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের। ভয়াবহ দৃশ্য। মাঠে,ঝোপে, আলপথে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার গুলি, কার্তুজ, বহু এ কে ৪৭ রাইফেল। এসব দেখে শীতের কাঁপুনি কোনদিকে চলে গেল। ঘিরে ধরল আতঙ্ক।

যেখানে সেখানে গুলি বন্দুক পড়ে আছে। কারা আনল, কেন আনল এসব নিয়ে জেলা প্রশাসনের মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। জেলাশাসক শীতের মধ্যে ঘামতে ঘামতে কলকাতায় ফোন করলেন। জেলা পুলিশ কর্তারা ছুটলেন যে যেখানে আছেন-এই গুলি বন্দুকের বৃষ্টির রহস্য ভেদ করতে।

খবর গেল মহাকরণে। খবর পেলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। আর ক্ষমতাসীন সিপিআইএমের পুরুলিয়া জেলা নেতৃত্ব দলটির রাজ্য নেতৃত্বকে রিপোর্ট পাঠালেন। সে এক গেল গেল পরিস্থিতি। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ঝালদা ঘিরে নিয়ে অভিযানে নামল পুরুলিয়া জেলা পুলিশ।

অস্ত্রবর্ষণ। পুরুলিয়ায় অস্ত্রবর্ষণ। গুলি রাইফেল যে এভাবে আকাশ থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে পারে তা বিশ্বে নজিরবিহীন।  পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাবি করে এটি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র। কলকাতা-দিল্লি সরগরম।

‘পুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ’ মামলায় জড়িয়েছে আনন্দমার্গ সংগঠনের নাম। পুরুলিয়া থেকেই এই সংগঠনটি তাদের মতো করে বিভিন্ন কাজে জড়িত।  বিমান থেকে ফেলা অস্ত্রের বিপুল সম্ভারে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেয়। তদন্তে বিভিন্ন দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নাম উঠে আসে। গ্রেফতার করা হয় প্রায় সবাইকে। ধৃতদের অন্যতম ডেনমার্কের কিম ডেভির বিস্ফোরক বয়ান- “Papu Yadav helped me escape from airport”, গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে পাপ্পুর সঙ্গে আনন্দমার্গ সংযোগ সূত্র।

পুরুলিয়া অস্ত্র বর্ষণে ধৃত কিম ডেভির বিস্ফোরক দাবি, কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভারত সরকারের চোখের সামনে দিয়ে তাকে নেপাল নিয়ে গিয়েছিল পাপ্পু। সেই বিবরণ দিয়ে শোরগোল ফেলে দেয় কিম ডেভি। তার বয়ান, নেপাল সীমান্ত পার করিয়ে কাঠমাণ্ডু পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে পাপ্পু যাদব। নেপাল থেকেই ডেনমার্ক নিরাপদে ফিরেছিল কিম ডেভি।

Pataliputra Special story

এই পাপ্পু পূর্ণিয়ার দখল নিয়েছে। দুনিয়া থেকে সরানো হয়েছে সিপিআইএম বিধায়ক অজিত সরকারকে। পাপ্পুর তখন প্রবল প্রতাপ। পাপ্পু যাদবের পাশাপাশি তীব্র আলোচিত বিহারের আর এক মাফিয়া সূরজভান সিং। মোকামা, মুঙ্গের,বেগুসরাই, লক্ষ্মীসরাইয়ের মতো ‘হট’ এলাকার কন্ট্রোল তার হাতেই থাকে। এমপি, বিধায়ক হয়েছে নির্ভাবনায়।

বিহারের বাহুবলী রাজনীতির ভিতর উঁকি মারলে মিলবে ধানবাদের ‘কয়লা মাফিয়া’ সূরজদেও সিং আর মোকামার সূরজভান সিংয়ের নাম। তবে  বিহারের বাহুবলীদের তালিকায় তারা কেউ পাপ্পু যাদবের উচ্চতায় উঠতে পারেনি এখনো! পাপ্পুকে কিছুটা রুখে দিয়েছিলেন অজিত সরকার।

নব্বই দশকের বিহারে রাজনৈতিক হত্যা, জাতিবাদ ভিত্তিক গণহত্যা, আর মাফিয়াদের দৌরাত্মের হরেক কিসিমের কিস্সা ছড়িয়ে আছে। দশক শেষ হয়ে আসছিল। মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব ১৯৯৭ সালে পুরোপুরি ফেঁসে গেলেন পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে। ৯৫০ কোটির টাকার কেলেঙ্কারির ধাক্কায় কিন্তু সরকার পড়ল না, তবে লালু সরলেন। মুখ্যমন্ত্রী হলেন গাই-ভৈঁষ সামলানো, রোটিয়া পাকানো নিখাদ গৃহবধূ রাবড়ি দেবী। আড়ালে সেই লালুপ্রসাদ।

পাটনার এই রাজনৈতিক তাপ উত্তাপের বাইরে গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল বিহারের সেই একই পরিস্থিতি। গণহত্যার বদলায় গণহত্যা।  কেথাও অতিবাম সংগঠনের গুলিতে গ্রাম জুড়ে উঁচুবর্ণের ভূমিহার, ব্রাহ্মণদের লাস পড়ে থাকছে। কোথাও রণবীর সেনার হামলায় দলিত, ওবিসি, নিচু জাতের মৃতদেহের স্তূপ জমা হচ্ছে। রক্তে লেখা হচ্ছিল এই খতিয়ান।  এমনই সময়ের কথা। জানুয়ারির শীতল রাতের জেহানাবাদের সাঁখারিবিঘা গ্রামে নেমেছিল ঘুম। সে এক কালরাত্রি। (চলবে)

গত পর্ব: Pataliputra: ১ টাকার প্রচার করতেন CPIM বিধায়ক! ১০৭টি গুলি ঢুকেছিল অজিত সরকারের দেহে

(সব খবর, সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে পান। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram এবং Facebook পেজ)